হাফিজুল ইসলাম লস্কর, সিলেট:
লাগামহীন সবজি বাজার, প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির দাম। ফলে দিশেহারা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির উর্ধমুখী দামে নাকাল সিলেটবাসী। সবজি বাজারে বর্তমানে যেনো অগ্নি হাওয়া বইছে। গত প্রায় তিন সাপ্তাহ ধরে বাজারে সব ধরণের পণ্যের দাম উর্ধ্বমুখী। কিছু কিছু তরকারীর দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
অনেকটা লাগামহীন ভাবেই বাড়ছে প্রতিটি পণ্যের দাম। চল্লিশ টাকার নীচে বলতে গেলে কোনো সবজিই পাওয়া যাচ্ছেনা। প্রায় সবধরণের সবজির দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে উঠানামা করছে। সেই তুলনায় কেবল পেঁপের দাম কিছুটা কম দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে কাঁচা মরিচ এবং লেবুর দাম। কাঁচামরিচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২শ টাকা কেজি আর লেবু ৪০ টাকা হালি।
আবার বাজার ভেদে দামের বেলায়ও কিছুটা তারতম্য দেখা গছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই তারতম্য কেজি প্রতি ১৫থেকে ২০টাকা ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। একই অবস্থা শাকের বেলায়। এর ফলে কেবল যে নিম্ন আয়ের মানুষেরই নাবিশ্বাস উঠছে তা নয় বরং চিন্তার রেখা স্পষ্ট দেখা দিয়েছে অনেক উচ্চবিত্তদের বেলায়ও। নগরীর প্রায় সবগুলো বাজারেরই একই অবস্থা। তবে বাজারের এই চিত্র নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের। ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম বাড়াচ্ছে আর বিক্রেতারা বলছেন বাজরে পন্য সরবরাহ কম। ফলে বেশি দামে তাদের পন্য কিনে আনতে হচ্ছে। আর বাজার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন কয়েক দফা বন্যা এবং বৃষ্টির কারণে এবার সবজির আবাদ ব্যহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। তবে অক্টোবরের শেষের দিকে নতুন সবজি বাজারে এলে দাম অনেকটা কমে আসবে বলে জানান তারা।
বুধবার (১১অক্টোবর) নগরীর কাঁচাবাজারগুলোতে দেখা গেছে সবজির দাম বেশ চড়া। নগরীর বন্দরবাজারের লালবাজার ও ব্রহ্মময়ীবাজার, আম্বরখানা বাজার, রিকাবীবাজার, কাজিরবাজার সহ বেশিকিছু ছোটবড়ো বাজার এবং সবজিওয়ালাদের কাছে ঘুরে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচামরিচ ২শ টাকা কেজি। এছাড়া পটল বিক্রি হচ্ছে ৫০থেকে ৫৫টাকা কেজি, করোলা, ঝিঙে, শসা এবং টমেটো মান ও আকার ভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, কচুর মুখি ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা, আলু ১৭ থেকে ২০ টাকা, পেঁপে ২০ থেকে ৩০ টাকা, সীম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা এবং মূলা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা করে কেজি। ঢেড়স বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা। এছাড়া লেবু বুড়ো আকারের একটি ১শ থেকে ১শ ২০ এবং ছোট লেবু হালি প্রতি ৪০ টাকা। লাল শাঁক বিক্রি হচ্ছে আটি প্রতি ৪০ টাকা। পুঁইশাক বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি।
প্রতিটি সবজিতে দুই সাপ্তাহের ব্যবধানে এই অনুপাতে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকার মতো। সেই ক্ষেত্রে কিছু কিছু সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
বাজারের এই অবস্থায় ক্রেতাদের অনেকে জানান তারা দুই সাপ্তাহ আগে যে দামে সবজি কিনেছেন এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে সবজি কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। নিতান্ত যেটুকু প্রয়োজন কেবল সেটুকুই কিনে বাড়ি ফিরছেন। তারা বলছেন এটা ব্যবসায়ীদের অসাধু কারসাজি কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। কেননা সবজির দাম বাড়তে পারে কিংবা কমতে পারে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু দাম বাড়ার বেলায় এতো বেশি তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
নগরীর বন্দরবাজারে কথা হয় উপশহরের ফজল মিয়ার সাথে। তিনি জানান, তার ডায়াবেটিস। তাই তার খাবারে মূলত সালাদ এবং সবজিই বেশি থাকে। গত দুই সাপ্তাহ আগে তিনি যে শশা ৩৫ টাকা দিয়ে কিনেছেন সেই শশা এবার তার কাছে ৭০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। কদিন আগে যে লেবু ১২ টাকা দিয়ে হালি কিনেছেন সেই লেবু দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ টাকায়। তিনি বলেন বাজারের এই অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেনো এর লাগাম টেনে ধরার কেউ নেই। সুযোগ পেলেই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেয়। এমনিতেই চালের বাজারে উর্ধ্বগতি তার উপর তরকারি বা সবজির এই অবস্থায় মানুষজন কিভাবে খেয়ে বাঁচবে।
দাম বাড়ার ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা বলছেন বাজারে সবজির সরবরাহ কম তাই দাম বেশি। কয়েক দফা বন্যা আর বৃষ্টির কারণে এবার নিয়মিত সবজির আবাদ ব্যহত হয়েছে। তার উপর গত কিছুদিন আগের কয়েকদিনে বৃষ্টিতে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এর প্রভাব বাজারে পড়েছে।
নগরীর প্রসিদ্ধ সবজি বাজার ব্রহ্মময়ী বাজার ব্যবসায়ী সমিতি নেতা মো. আতিকুর রহমান জানান, গেলো কয়েকদিনের বৃষ্টিতে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া এবারের বন্যার কারণে কৃষকরা সবজির আবাদ করতে পারেননি। ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কম। সিন্ডিকেটের বেলায় তিনি বলেন, কাঁচাবাজারে সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই। আসল কথা হলো বন্যা এবং বৃষ্টির কারণে সবজির আবাদ অন্য বারের মতো হয়নি। সবজির আবাদ না হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কম। আগামী কিছুদিনের মধ্যে নতুন সবজি বাজারে এলে দাম কমে যাবে। বাজারভেদে দামের তারতম্যের বেলায় তিনি বলেন, এটা মানের উপর নির্ভর করে। ভালো মানের সবজির বেলায় দাম কিছুটা বেশি। যেসব সবজি এক বাজারের তুলনায় অন্য বাজারে কিছুটা কমে মিলছে সেগুলো মানের দিক দিয়েও বেশ পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বাজার কর্মকর্তা শাহ মো. মোরশেদ কাদের জানান, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় সবজির দাম কিছুটা চড়া। সরবরাহ কম থাকলে দাম কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া এবারের বন্যা এবং বৃষ্টির কারণে সবজির আবাদে সমস্যা হয়েছে। ফলে এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। তবে অক্টোবরের শেষের দিকে নতুন সবজি এলে সেই সমস্যা থাকবেনা বলে জানান তিনি।
সবজির উর্ধমুখী দামে দিশেহারা সিলেটবাসী

মতামত.........