,

রোহিঙ্গা সংকট, কয়েকজন সহকর্মীর বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক সাংবাদিকতা (প্রথমপর্ব): কাফি কামাল

কাফি কামাল:

আরাকান প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে নির্মূল করতে চায় বার্মা। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রিত পুতুল সরকার, উগ্রজাতীয়তাবাদী মগ ও ধর্মান্ধ মঙ সবাই এ ইস্যুতে একমত। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন এই প্রথম নয়। শতাব্দী ধরে চলে আসছে এ নির্যাতন। কিন্তু এককালে নাগরিকত্ব ছিল, মৌলিক অধিকার ছিল, রাজনীতির অধিকার ছিল। ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে একের পর এক অধিকার। দিনে দিনে কমিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের সংখ্যা। শিক্ষা-চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়ে তারা এখন দুনিয়ার সবচেয়ে মজলুম জাতিগোষ্ঠী।

নির্মূলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বার্মা ও দেশটির গডফাদার, সহায়তাকারী বন্ধুরা অব্যাহত অপপ্রচার চালিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায় মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠী হিসেবে। চলমান নিধনযজ্ঞের ভয়াবহতা যখন অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে তখনও তারা সে একই সুরে কথা বলছে। লাখ লাখ মানুষ কেন তাদের বসতভূমি, সহায়-সম্পদ ছেড়ে অজানার উদ্দেশে চলে আসছে সেটা কেউ বলছে না। মগের মুল্লুকের বন্ধুদের কাছে বড় হচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত বড় এক ক্ষতির মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গারা যদি জঙ্গিই হয় তবে মোড়ল দেশগুলোর কেউ ভাবছে না, কেন সন্ত্রাসীদের পাশের অন্য একটি দেশে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার মানে তাদের কাছে মগের মুল্লুক গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশ নয়। আসলে বার্মার অর্থনৈতিক স্বার্থ, চীন-ভারতের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই যে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করে দিচ্ছে, মানুষকে পরিণত করছে অমানুষে-পশুতে; সে ব্যাপারে অজ্ঞ নয় বিশ্ব। দুনিয়াজুড়ে প্রতিবাদে সোচ্চার তাই বিবেকবান মানুষ।

কিন্তু এমন সময়েও আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষিত, সমাজে প্রতিষ্ঠিত কিছু মানুষ বার্মার অপপ্রচারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গান গাইছেন। স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিয়ে নানা ধরনের কথা থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটে সাংবাদিকতাকে অন্য একটি মাত্রায় নিয়ে গেছেন কিছু বিবেকবান সাংবাদিক। তারা নানা তথ্য-উপাত্তে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত এবং মানবতার নিশানকে উড্ডীন করেছেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী সাংবাদিকদের রয়েছে ভাষাগত দূরত্ব। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটে এসব দূরত্ব উবে গেছে অনুসন্ধিষ্ণু চোখ, মানবিক মন আর দায়িত্ববোধের আন্তরিকতায়। আরাকানে নৃশংসতার তথ্যগুলো প্রতিদিন তাদের লেখনির মাধ্যমে হাজির করছেন আমাদের সামনে। বস্তুনিষ্ঠতা ও মানবিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন। তাঁদের স্থানীয় প্রতিনিধি সাংবাদিকরাও নিশ্চয়ই এ কৃতিত্বের অংশীদার। স্যালুট, প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ।

বাংলাদেশে অনুসন্ধানী ও সৎ সাংবাদিকতায় একটি উজ্জ্বল নাম রাজিব নূর। দেশের সেরা সব কাগজে কাজ করেছেন আর ছেড়েছেন। গল্প লিখেন, আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রকাশকের ভূমিকায়ও। মোনাজাত উদ্দিনের যে তৃণমূল সাংবাদিকতা সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সাম্প্রতিক কালে দেশের প্রতিটি দুর্যোগ-দুর্বিপাকে শহর থেকে শহর, গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে যিনি সবচেয়ে বেশি সরেজমিন প্রতিবেদন করেছেন তার নাম রাজিব নূর। প্রাকৃতিক আর মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো তিনি কেবল সাংবাদিকের অনুসন্ধিষ্ণু চোখেই নয়, দেখেন মানবিকতার অর্ন্তদৃষ্টিতে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমকালে প্রকাশিত তার প্রতিবেদন ‘জীবন যেন কচুরিপানা’, সেপ্টেম্বর অন টেকনাফ রোড’, ‘পরিত্যক্ত এক বার্মিজ নৌকার গল্প’ যেন সত্যিই এক একটি মানবিক মহাকাব্য।

আমার বন্ধু কবি রহমান মাসুদ কাজ করেন দেশের অন্যতম প্রধান অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি তার নিষ্ঠা প্রশ্নহীন। ‘সেপ্টেম্বর অন টেকনাফ রোড’ শিরোনামের হৃদয়গ্রাহী প্রতিবেদনটি ছাড়াও মোহাম্মদ ইদ্রিস নামে এক রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যে সব তথ্য পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন তা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে অনেকের বিভ্রান্তি দূর করবে। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে তথ্য-উপাত্তে খুলে দেবে আমাদের মনের চোখ।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ইত্তেফাক নিজেই একটি ইতিহাস। সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে ইত্তেফাকের অবস্থান বেশ সুদৃঢ়। আমরা অনেকেই পরিস্কার জানি না রোহিঙ্গা মুসলমান ও হিন্দুদের সমন্বয়ে একটি জাতিগোষ্ঠী। বার্মার সামরিক জান্তা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী নীতি হিসেবে রোহিঙ্গাদের সে দেশের একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে নয় মুসলিম জঙ্গি জাতিগোষ্ঠী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করা। আমাদের দেশের অনেকেই রোহিঙ্গাদের দেখে বার্মার সামরিক নিয়ন্ত্রিত সরকারের আয়না। কিন্তু ইত্তেফাকই এবার ‘রোহিঙ্গা নিধনে রাজি না হওয়ায় হিন্দুদের হত্যা করছে মিয়ানমার সৈন্যরা’ শীর্ষক তথ্যবহুল এক প্রতিবেদনে পরিস্কার করেছে সেখানে মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুরাও রাখাইন মগদের হাতে কম নির্যাতিত নয়। এ প্রতিবেদনটি আমাদের অনেকের ছানিপড়া চোখের ছানি কাটাবে বলে বিশ্বাস করি। বস্তুনিষ্ঠ এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আজহার মাহমুদ দেখিয়ে দিয়েছেন প্রোপাগাণ্ডা নয় সত্য প্রকাশই সাংবাদিকতা।

মানবজমিনে আমার সহকর্মী মিজানুর রহমান কাজ করেন কূটনৈতিক পাড়ায়। একজন মন্ত্রীর উড়াল কূটনীতি নিয়ে প্রতিবেদন লিখে মামলার আসামী হয়েছেন। লোভ-প্রলোভন তাকে টলাতে পারেনি। সর্বদা ফিটফাট থাকা লোকটি দিনের পর দিন ছুটে বেড়াচ্ছেন রোহিঙ্গা উপদ্রুত এলাকায়। সন্ধান করছেন সত্যের, লিখছেন হৃদয় নিংড়ানো সব প্রতিবেদন। কূটনীতির বঙ্কিম বাক্যচয়ন নেই তার সত্য উপস্থাপনে। আমার আরেক সহকর্মী মহিউদ্দিন অদুল ঈদের আগে থেকেই পড়ে রয়েছেন উখিয়া-টেকনাফে। প্রতিদিনই লিখেছেন হৃদয়মথিত সব প্রতিবেদন।

মাহমুদ আজহার রাজনৈতিক বিটের সাংবাদিকতায় আমার ঘনিষ্ঠদের একজন। রাজনীতির সংবাদ ফেলে তিনি ছুটে গেছেন বার্মা সীমান্তে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত তার ‘জীবন শুরু হচ্ছে শরণার্থী হিসেবে’ প্রতিবেদনটি আপনাকে ভাবাবে, কাঁদাবেও। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা হিন্দুদের নিয়ে তার প্রতিবেদন ‘কেমন আছেন হিন্দু শরণার্থীরা’ বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের জন্য একটি জবাব বটে।

আমাদের সময়ের ক্রাইম বিটের কাজ করেন আমার ঘনিষ্ঠতম অনুজ হাসান আল জাভেদ। সাহসী এ তরুণ সাংবাদিক ঘুরেছেন সীমান্তের ওপারে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ড ছাড়িয়ে এক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখেছেন বর্বরতার চিহ্ন । তার ‘সেনা অস্ত্র মগের হাতে’, ‘তরুন যুবাদের নির্বিচারে হত্যা’, ‘রাখাইনে পুলিশের স্থাপনা পুড়িয়েছে সেনা-মগেরাই’ প্রতিবেদনগুলো পড়লে পরিস্কার হয় ক্রাইম রিপোর্টার অনুসন্ধিষ্ণু দৃষ্টিতে সে কিভাবে তুলে এনেছেন আসল ঘটনা। তার ‘তমব্রুর মুসলিমপাড়া এখন মগের মুল্লুক’ প্রতিবেদনটি বিমর্ষ করে দেয়।

বাংলাদেশে কূটনৈতিক সাংবাদিকদের মধ্যে উজ্জ্বল একটি নাম মাসুদ করিম। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিবেদন লিখেছেন। যুগান্তরে প্রকাশিত তার ‘রোহিঙ্গা নির্মূলে পরিকল্পিত গণহত্যা, জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী’ ও ‘মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক শক্তিগুলো নির্বিকার’ প্রতিবেদনগুলো আমাদের সামনে পরিস্কার করে দেয় এ সংকটের পূর্বাপর।

আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন নিউএজ-এর তরুণ সাংবাদিক মহিউদ্দিন আলমগীর। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির একজন মানুষ তিনি। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে লেখা সরেজমিন প্রতিবেদনগুলোতে স্বচ্ছ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক সাংবাদিকতার একটি মেলবন্ধন ঘটিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন। মহিউদ্দিন আলমগীর ও ডেইলি স্টারে কর্মরত একজন সিনিয়র সহকর্মী পিনাকী রায়ের প্রতিবেদনগুলো বাংলাদেশের উঁচু শ্রেণি, ব্যবসায়ী, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সামনে তুলে ধরছে রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা।

রোহিঙ্গা সংকটে মানবিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতায় আত্মনিবেদিত ভূমিকা জন্য এসব সহকর্মীকে নিয়ে আমি গৌরববোধ করব আজীবন।

কাফি কামাল: লেখক ও সাংবাদিক

মতামত.........