,

রোহিঙ্গাদের মরণফাঁদ: মিয়ানমার সীমান্তের স্থলমাইন

সংবাদ সবসময় ডেস্ক:

নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যেন আর দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরের প্রতিটি পয়েন্টে স্থলমাইন (ল্যান্ডমাইন) বসানো হয়েছে। এর ফলে এই সীমান্ত এখন বাংলাদেশে আসতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য যেমন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে, তেমনি তাদের দেশে ফিরে যাওয়াও শঙ্কার মুখে পড়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি অন্তত ২০টি পয়েন্টে নতুন করে এসব স্থলমাইন বসানো হচ্ছে বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ভূখণ্ডে এসব মাইন বসানো হয়েছে বলে শরণার্থী রোহিঙ্গারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সময় ৩ রোহিঙ্গা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়াও সীমান্ত পার হতে গিয়ে একজন বাংলাদেশিও স্থল মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও সীমান্তের স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংস ঘটনার পর থেকে সীমান্ত সুরক্ষার নামে নতুন করে স্থলমাইন বসিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী। বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু, রেজু আমতলী, বাইশফাড়ি, জলপাইতলী, জামবনিয়া, ধামনখালী, রহমতেরবিল, বালুখালী, পালংখালী আন্জুমানপাড়া, হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, উনচিপ্রাং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরের এলাকাগুলোসহ নাফ নদীর ওপারের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থলমাইনগুলো বসানো হয়। এরমধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তের ওপারের এলাকাগুলো বেশি বিপজ্জনক বলে দাবি করেছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

তুমব্রু সীমান্তের ওপারে আধা কিলোমিটার ভেতরের মিয়ানমার অংশে বাড়ি রোহিঙ্গা মোহাম্মদ তাহেরের।সহিংস ঘটনার পর থেকে তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে খালের পাড়ে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।সারাক্ষণ তার নজর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দিকে। সেনা সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে কৌশলে দিনে একবার নিজ বাড়িতে ঘুরে আসেন তিনি। বাড়ির অবস্থা দেখে আবারও সীমান্তের বস্তিতে চলে আসেন।

তাহের জানান, গত এক সপ্তাহ আগে দিন-দুপুরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তুমব্রুর প্রবেশ পথ লক্ষ্য করে স্থলমাইন বসিয়ে চলে যায়। সেনাবাহিনী চলে গেলে কয়েকজন প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পুঁতে রাখা মাইনগুলো তুলে ফেলেন এবং কৌশলে বিস্ফোরণ ঘটান। এছাড়াও সীমান্তের বিভিন্ন অংশে নতুন করে শত শত মাইন বসানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

শুধু তাহের নয়, সীমান্তের ওপারে বসবাসরত রোহিঙ্গা ইমাম হোসেন, সাজেদা বেগম ও জুবাইরসহ অনেকে জানিয়েছেন, এই পর্যন্ত অনেক রোহিঙ্গা নাগরিক ও গরু-ছাগল মাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে। এ কারণে মিয়ানমার অংশে প্রবেশ করা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন রোহিঙ্গা নারী সাবেকুন্নাহার (৫০)। তিনি প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছিলেন।তিনি মিয়ানমারের তুমব্রু বাজার এলাকার জাফর আলমের স্ত্রী। এখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সীমান্তের মিয়ানমার অংশে মাটিতে পুঁতে রাখা আরেকটি স্থলমাইনের বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা যুবক ইউসুফ নবী (২৮),মো. হাসান (২৫),মো. মামুন (২৫), নূর হোসেন (৯) ও ৪০ দিনের শিশু সোহানা আহত হয়। পরে উখিয়ার কুতুপালং ‘এমএসএফ ’ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ইউসুফ ও হাসান দু’পায়ে আঘাত পেয়েছে। তাদের স্বজনরা জানিয়েছে, এই দুই তরুণ সীমান্তে মিয়ানমার বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনে আহত হয়।’

এছাড়াও গত ১২ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের আশারতলী ছনখোলা সীমান্তের ৪৪ নং পিলারের কাছে একটি মাইনের বিস্ফোরণ ঘটে। নোম্যান্স ল্যান্ড থেকে মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে পড়া গরু ফেরাতে গিয়ে ওই বিস্ফোরণে নিহত হন মোহাম্মদ হাশেম নামের এক বাংলাদেশি। এসময় এক রোহিঙ্গাও আহত হন। আহত রোহিঙ্গাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

উখিয়ার কুতুপালং কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকের তত্ত্বাবধায়ক ডা.অজিদ কুমার বড়ুয়া বলেন,‘আগে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী হতো তা এখন দাঁড়িয়েছে ১০০ থেকে ১৫০ জনে। নতুন করে রোহিঙ্গারা আসার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। বর্তমানে যারা চিকিৎসা নিতে এসেছেন তাদের অধিকাংশ গুলিবিদ্ধ ও মাইন বিস্ফোরণে আহত। এদের কারও হাতের কব্জি, আবার কারও পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাকিরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ২০৮ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত এবং ৬৪ কিলোমিটার নৌসীমান্ত। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে বলে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের ধারণা। অথচ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সাতদিনের সীমান্ত বৈঠকে সীমান্তের শূন্যরেখার আশেপাশে পুঁতে রাখা মাইন ও আইইডি অপসারণে দুই পক্ষ সম্মত হয়। কিন্তু, নানা কারণে সীমান্তের সেই মাইন অপসারণ প্রক্রিয়াটি মিয়ানমার এখনও ঝুলিয়ে রেখেছে।

সুত্র: বাংলা ট্রিবিয়ন

মতামত.........