,

মিতু হত্যাকারী সাতজনই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মুসা সাকার ক্যাডার

3_45666আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম সবসময় :

চট্টগ্রামে আলোচিত এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় অংশ নেয়া সাতজনের নাম এসেছে ১৬৪ ধারায় আদালতে দেয়া দু’জনের জবানবন্দিতে। সংবাদ সবসময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এরা সবাই চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। এদের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির বহু মামলা।
বিগত বিএনপি সরকারের আমলে আবু মুসার নেতৃত্বাধীন এ গ্রুপটি বিশেষ করে রাঙ্গুনিয়ায় ছিল দাপটের সঙ্গে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর তথা বিএনপির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিল আবু মুসা। বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তারা চট্টগ্রাম শহরে চলে আসে। মুসা চট্টগ্রাম শহরে এসে আরেক সন্ত্রাসী রাজাখালীর বাসিন্দা এহতেশামুল হক ভোলার সঙ্গে বালুর ব্যবসার পাশাপাশি দখল-চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াত। অন্যদেরও অপকর্মে ব্যবহার করত। শহরে বসবাস করলেও এসব সন্ত্রাসী বিভিন্ন সময়ে রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে গিয়ে খুন-ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম করত। দু’মাস আগেও মুসা রাঙ্গুনিয়ায় এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে হত্যা করে। রাজনৈতিক কারণে ওই হত্যায় যুক্ত হয় মুসা। জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে- আবু মুসা, মোতালেব ওরফে ওয়াসিম, এহতেশামুল হক ভোলা, আবদুল নবী, রাশেদ, শাহজাহান ও কালু। ৫ জনের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া, একজনের ফটিকছড়ি ও অপরজনের বাড়ি চট্টগ্রাম মহানগরীতে।
মোতালেব ওরফে ওয়াসিম : মিতু হত্যার দায় স্বীকার করে ওয়াসিম। রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের পূর্ব গলাচিপার আবদুল নবীর ছেলে সে। জীবনে স্কুলের বারান্দা মাড়ায়নি। রাঙ্গুনিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুটি হত্যা, একটি অস্ত্র ও দুটি ডাকাতি মামলা। এছাড়া মারামারি ও চাঁদাবাজির ডজনখানেক অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা জানান, ওয়াসিমের নাম শুনলেই উত্তর রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর, রাজানগর ও দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের মানুষ আঁতকে উঠত। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা সে করেনি। ছোটবেলা থেকেই বখাটে ওয়াসিম বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী জসিম উদ্দিন ওরফে ন্যাংটা জসিমের বাহিনীতে যোগ দিয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠে। দক্ষিণ রাজানগর গোট্টারকুলের এক নারীকে তুলে এনে বিয়ে করে সে।
২০০৩ সালের ইউপি নির্বাচনের পর ন্যাংটা জসিমের সঙ্গে একে-৪৭ রাইফেল ও বিপুল গোলাবারুদসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ওয়াসিম। ২০১২ সালের ১১ আগস্ট কুপিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ মিয়া চৌধুরীকে হত্যা করে। ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট চকরিয়া কড়িয়ারঘোনা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে রানীরহাট বাজারে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম তালুকদারকে গুলি করে হত্যা করে। চাঁদা না দেয়ায় এ ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। এরপর সে আশ্রয় নেয় চট্টগ্রাম শহরে। এখান থেকেই রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ও রাজানগরে শতাধিক ইটভাটা থেকে নিয়মিত চাঁদা নিত। স্থানীয়রা জানান, মোবাইল ফোনে বললে চাঁদা পৌঁছে দিতেন ব্যবসায়ীরা। না দিলেই রাতের আঁধারে হামলা চালাত। বাড়ি নির্মাণ ও জমি কিনলে ওয়াসিমকে দিতে হতো চাঁদা। চট্টগ্রাম শহরে সতীর্থ আবু  মুসা ওরফে সিকদারের শেল্টারে থেকে ইয়াবা ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
আনোয়ার হোসেন : রাঙ্গুনিয়ায় কিলার আনোয়ার হিসেবে পরিচিত। বাবার নাম শামসুল আলম। রাঙ্গুনিয়ায় বাড়ি হলেও ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মনুর টিলা এলাকায় ঘরজামাই থাকত। ২৩ জুন পুলিশ সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করে। মিতু হত্যায় পাহারাদারের ভূমিকায় থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশ জানায়, আনোয়ারের অন্ধকার জগতে হাতেখড়ি ওয়াসিমের হাতে। রানীরবাজারে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই মাস আগে ইসলামপুর ইউনিয়নে মহসিন হত্যায় সে জড়িত। মামলা না থাকলেও উঠতি সন্ত্রাসী হিসেবে থানায় তার নাম রয়েছে।
এহতেশামূলক হক ভোলা : নগরীর রাজাখালীর সিরাজুল ইসলামের ছেলে ভোলা। একসময় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিল। সিএমপির  টপটেন সন্ত্রাসীর একজন। তার বোন বকুলিসহ নগর পুলিশের সন্ত্রাসী তালিকার ৭ জনই ছিল ভোলার পরিবারের সদস্য। এ ৭ জনের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, রহাজানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে কমপক্ষে ১০০ মামলা ছিল। বর্তমানে ভোলার বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। বাকলিয়া রাজাখালী এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সব সময় সঙ্গে থাকত ১৪-১৫ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী। তার অত্যাচারে বাকলিয়া এলাকার মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। সাম্প্রতিক সময়ে সে হজ করলেও অস্ত্র ভাড়া দেয়া থেকে সরে আসেনি।
পুলিশ জানায়, ২০০০ সালের পর ভোলা ও তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বাকলিয়া বৌবাজার, কোরবানীগঞ্জ ও রাজাখালী এলাকায় মাদকসহ সব ধরনের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করত। এলাকার ব্যবসায়ী, বাড়ি মালিক ও খেটে খাওয়া মানুষ ভোলা এবং তার বাহিনীর হাতে জিম্মি ছিল। যে কোনো কিছু করতে গেলেই তাকে চাঁদা দিতে হতো।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে বাবুল আক্তার সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে কোতোয়ালি জোনে যোগ দেন। তখন বাবুল আক্তারের প্রধান সোর্স ছিল রাঙ্গুনিয়ার আবু মুসা ওরফে মুসা সিকদার। আবু মুসার তথ্যে ২০০৯ সালে বাবুল আক্তার গ্রেফতার করেন ভোলাকে। জেল থেকে বের হয়ে ভোলা বাবুল আক্তারের সঙ্গে দেখা করে ভালো হয়ে যাওয়ার জন্য সুযোগ দাবি করে। এরপর থেকে ভোলা বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করে। ভোলার দেয়া তথ্যে বাবুল আক্তার পরে বাকলিয়া রাজাখালীতে অনেক সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেন।
আবু মুসা ওরফে মুসা সিকদার : রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ইউনিয়নের ঘাগড়া এলাকায় মামার বাড়িতে থাকত আবু মুসা। বাড়ি পারুয়া ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামে। বিডিআরের (বিজিবি) অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার আপন চাচা ফারুক সিকদারের কন্যাকে বিয়ে করে। ওয়াসিম ও আনোয়ারের জবানবন্দিতে উঠে আসে মিতু হত্যাকাণ্ডের মূল প্ল্যানার আবু মুসা। খুনিদের টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে। হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সোর্স হিসেবে বিভিন্ন অপকর্ম, খুন রাহাজানি করে বেড়াত। তার বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানায় দুটি হত্যা মামলা, একটি ডাকাতি মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা জানান, আবু মুসা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। ২০০৬ সালে তাকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় তৎকালীন এমপি সাকা চৌধুরী তাকে ছাড়িয়ে নেন। স্থানীয়রা জানান, পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে বিভিন্ন অপরাধ করে পার পেত সে। চারদলীয় জোটের আমলে রাঙ্গুনিয়ায় অন্তত ৫টি ক্রসফায়ারের সঙ্গে মুসা জড়িত ছিল। এসব আসামিকে ধরিয়ে দেয়া বা তাদের সম্পর্কে তথ্য দিত মুসা। ক্রসফায়ারে যাওয়া ব্যক্তিরা হচ্ছে- উত্তর রাঙ্গুনিয়ার জামাল হাজারী, আলো জসিম, সদর ইছাখালী এলাকার ক্যারাটি সেলিম ও চন্দ্রঘোনার সেলু। পুলিশের সোর্সের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের উপজেলা রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন দুর্ধর্ষ ক্যাডার এবং অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। এরপর একের পর এক ঘটাতে থাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। কিন্তু মুসা পুলিশের সোর্স হওয়ায় পুলিশ কিংবা অন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে সন্দেহ করত না। ফলে মুসা হয়ে উঠে অন্ধকার জগতের ‘ডন’। তার ইশারায় উত্তর চট্টগ্রাম ও নগরীতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলত ফিল্মি স্টাইলে। কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু করলে সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসত নির্যাতনের খক্ষ।
মো. রাশেদ : একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনি। বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বদিউজ্জামান তালুকদার বাড়ি। বাবার নাম  আহমদ হোসেন প্রকাশ সোনা মিয়া। তার এক ভাই জহিরও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সে সম্পৃক্ত। তারও অপরাধজগতে প্রবেশ আপন মামা ন্যাংটা জসিমের হাত ধরে। রাশেদের বিরুদ্ধে ২টি খুন, ১টি অস্ত্র ও ডাকাতিসহ  অর্ধ ডজন মামলা রয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা রাশেদ ২০০৩ সালের ইউপি নির্বাচনের পর মামা ন্যাংটা জসিমের সঙ্গে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেফতার হয়। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে এসে রাশেদ মিয়া চৌধুরীকে হত্যায় অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম শহরে আত্মগোপন করে রাশেদ। তা সত্ত্বেও ভাড়াটে খুনি হিসেবে অংশ নেয়। কয়েক বছর ধরে সন্ত্রাসী রাশেদ চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করত মুসা সিকদার ও মামা জসিমের ছত্রছায়ায়। নগরীর বহদ্দারহাট ও কালামিয়া বাজার এলাকায় এ সন্ত্রাসী চক্রের আস্তানা। তারা ইয়াবা ও অস্ত্র চোরাচালানের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।
আবদুল নবী : রাঙ্গুনিয়ার এ সন্ত্রাসী অত্যন্ত চালাক। রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের পূর্ব গলাচিপা গ্রামের মুন্সি মিয়ার ছেলে সে। রাঙ্গুনিয়া এলাকায় প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে। অপরাধ কর্মকাণ্ড করে প্রমাণ নষ্ট করতেও তার জুড়ি নেই। আবদুল নবী অপরাধজগতে প্রবেশ করে ওয়াসিমের হাত ধরে। চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। অহরহ অপরাধ করলেও তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা নেই। কখনও গ্রেফতারও হয়নি এ সন্ত্রাসী। তবে রাঙ্গুনিয়া থানার অপরাধীদের তালিকায় উঠতি সন্ত্রাসী হিসেবে নাম আছে তার। বিয়ে করেছে দুইটি। তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে যান প্রথম স্ত্রী। সূত্র জানায়, গত বছরের মে’তে এক অটোরিকশাচালককে ছুরিকাঘাত করে ট্যাক্সি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে সে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে মামলা করার সাহস পাননি ওই চালক। আবদুল নবীকে ধরতে এলাকার লোকজন মানববন্ধনও করে। সোর্স মুসা সিকদারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মিতু হত্যায় মোটরসাইকেলের তিন আরোহীর একজন সে।

 

মতামত.........