,

বিজয়ের ২ দিন পর হানাদার মুক্ত হয়েছিল গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া

কাশিয়ানীতে ভাটিয়াপাড়া মুক্ত দিবস ও মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ অনুষ্ঠিত।

এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ :

মঙ্গলবার গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ভাটিয়াপাড়া মুক্ত দিবস ও মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী এমদাদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য লে. কর্নেল (অব:) মুহম্মদ ফারুক খান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন নার্গিস রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদ হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুন্সি আজিজুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিন আলী। অনুষ্ঠানে অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুদোজা বদর, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জুলফিকার আলী জুয়েল, কাজি জাহাঙ্গীর আলম, মশিউর রহমান খান, সৈয়দ ফারুক আহম্মেদ, রাতইল ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ পিনু।

অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্বাবধানে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম মানোয়ারুল করিম (লাভলু খান)। উক্ত অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মননা প্রদান করা হয়।

মুক্তি মিলেছিল বিজয়ের ২ দিন পর : ১৯ ডিসেম্বর কাশিয়ানী মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণে পাক বাহিনীর দখলে থাকা কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস ষ্টেশনের ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলেও কশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়ে ১৯ ডিসেম্বর সকালে।

গোপালগঞ্জ-ফরিদপুর-নড়াইল জেলার সীমান্তে অবস্থিত এবং ভৌগলিক ও যুদ্ধের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন ও নদী বন্দর ভাটিয়াপাড়া দখল নিয়ে পাক হানাদার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই হয় কয়েক দফা। পাক বাহিনীর ভাটিয়াপাড়া মিনি ক্যান্টনমেন্টটি গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্ভূক্ত হলেও ফরিদপুর-নড়াইল-গোপালগঞ্জ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য বস্তু ছিলো ভাটিয়াপাড়ার ওই মিনি ক্যান্টনমেন্টটি। পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী ৭১ সালের মে মাসে এখানে ওই অয়্যারলেস স্টেশনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। দীর্ঘ ৭ মাস ব্যাপী ৬৫ পাক সেনার শক্তিশালী একটি গ্রুপ এখানে অবস্থান করে এলাকার নিরীহ মুক্তিকামী মানুষের উপর নির্যতন, নিপীড়ন ও গণহত্যা চালায়। অনেক মুক্তিকামী মানুষকে হত্যাকরে পাক বাহিনী লাশ ভাটিয়াড়ার দিয়ে প্রবাহিত মধুমতি নদীতে ভাসিয়ে দিতো। পাক বাহিনীর একটি দল গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা সংলগ্ন জয়বাংলা পুকুরপাড়ের মিনি ক্যান্টনমেন্টন থেকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ৬ ডিসেম্বর রাতে পালিয়ে গিয়ে ভাটিয়াপাড়ার ওই ক্যাম্পে অবস্থান নেয়। ভাটিয়াপাড়ার পাক বাহিনীর মিনি ক্যন্টনমেন্টটি দখলে নিয়ে ৬ নভেম্বর দুইটি মারাতœক যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের টানা ১৫ ঘন্টা পাক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘায়েল করতে পাক বাহিনী আকাশ পথে বিমান থেকে গুলি ও বোমা বর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু সেদিন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটেনি। এ যুদ্ধে পাক বাহিনী যথেষ্ট ঘায়েল হয়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা মীর মহিউল হক মিন্টু , সাধুহাটির এ কিউএম জয়নুল অবেদীন শহীদ হন।

ওই অয়্যারলেস ক্যাম্প দখল নিয়ে দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধ হয় ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দিনে। ৩ দিন যুদ্ধের পর ১৯ ডিসেম্বর খুব ভোরে নড়াইল গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের দিক থেকে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারগণ সম্মিলিতভাবে ভাটিয়াপাড়া ক্যান্টনমেন্টে আক্রমন চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাতœক এ হামলা ও বীরোচিত সাহসী যুদ্ধে অবশেষে ১৯ ডিসেম্বর সকাল ১০ টার দিকে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে ৬৫ জন পাক সেনা আতœসমার্পন করে। এ যুদ্ধে ৬ পাক সেনা নিহত হয়। অপর দিকে মুক্তিযোদ্ধা মশিউর রহমান সিকদার, অনিল কুমার বিশ্বাস, মজিবর রহমান, মোহাম্মদ হান্নান শেখ নিহত হয়।

এরপর ভাটিয়াপাড়ার ওয়্যারলেস ষ্টেশনের মিনি ক্যান্টনমেন্টে উড়ানো হয় বাংলা দেশের মানচিত্র ও লাল সূর্য খচিত গাঢ় সবুজ জমিনের বিজয় পতাকা। হানাদার মুক্ত হয় কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া সহ সমগ্র গোপালগঞ্জ অঞ্চল। মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দে আতœহারা হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল বের করেন। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ এ বিজয় মিছিলে অংশ নিয়ে অনন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন।

মতামত.........