,

বিকলের গ্যাঁড়াকলে বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,দালাল দিয়ে রোগী টানেন চিকিৎসকরা !

রয়েছে হাজারো সংকট এর অযুহাত, নষ্ট পড়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স, বাড়েনি সেবার মান

বিকলের গ্যাঁড়াকলে বাঁশখালী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, বাড়েনি সেবার মান

বিকলের গ্যাঁড়াকলে বাঁশখালী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, বাড়েনি সেবার মান

মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর ৭ লক্ষ মানুষের ৫০ শয্যার একমাত্র সরকারী হাসপাতালটিতে বর্তমানে ডাক্তার-র্নাস বাড়লেও বাড়েনি সেবার মান। প্রতিদিন শত শত রোগী বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসলে ও চাহিদা অনুযায়ী সেবা না পেয়ে প্রাইভেট হাসপাতালের দিকে ঝুঁকে পড়েছে রোগীরা। এছাড়াও তীব্র পানি সংকট, র্নাস ও চিকিৎসক সংকট, ময়লা-আর্বজনার স্তুপ, দালালদের দৌরাত্ব্য আর বে-সরকারী অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের প্রভাবে মিলছে না কাংখিত সেবা। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

জরুরী চিকিৎসা সচল থাকলেও বহু ধরণের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ রোগীরা। চিকিৎসকদের অবহেলা, যন্তপাতি ব্যবহার, এনেসথেসিয়া ও ডেন্টাল চিকিৎসক সংকটে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। কোন কোন চিকিৎসক সরকারী অফিস সময়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরে বসেই প্রাইভেট প্র্যাকটিসে রোগী দেখার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধি (এম.আর) ও ল্যাবের দালাল মোসলেম উদ্দীন, জালাল, মেজবাহ, আজগর, সরওয়ার, বাবলু, ওয়াহেদ, শিশির, বিপুল, ইউনুছ, জলিল সহ আরো বেশ কয়েক জনের বিরুদ্ধে হাসপাতালের অভ্যান্তরে রোগী হয়রানীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। নার্স ও সেবকদের অভদ্র ব্যবহারের পাশাপাশি ভুক্তভোগী রোগীরা অভিযোগ করেন, জরুরী প্রয়োজনে হাসপাতালে ডাক্তারদের পাওয়া যায় না। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা ঘন্টার পর ঘন্টা ডাক্তারদের কাছে আবেদন জানালেও তারা রোগী না দেখে মোবাইল ফোন কিংবা নিজস্ব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নতুন কিংবা পুরাতন নিয়োগ পাওয়া অনেক ডাক্তারকে হাসপাতালে ডিউটির সময়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল কানে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। অনেক ডাক্তার ইমার্জেন্সি রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েও দেখা যায় একেই অবস্থা। আবার কেউ কেউ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। এতে করে চিকিৎসা সেবা ব্যাঘাত ঘটানোর পাশাপাশি রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে বলে জানান রোগীরা।

সীট না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা

সীট না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা

বাঁশখালী হাসপাতাল পরির্দশন কালে দেখা যায়, সরকার গত বছরে নতুন এক্স-রে মেশিন দিলেও টেকনেশিয়ানের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। ইতিপূর্বে মাস দুই এক আগে এক্স-রে মেশিন পরিচালনার করার জন্য দোহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এক জন টেকনেশিয়ান এনে সপ্তাহে একদিন করে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে বাইরের ল্যাব গুলোই রোগীদের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। চেম্বারে প্র্যাকটিস করা চিকিৎসকরা হাসপাতালের চেয়ে তাদের নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখতে বেশি উৎসাহী। চেম্বারে রোগী টানতে এক শ্রেণীর দালাল চক্রকে কমিশন দিয়ে চিকিৎসকরা চেম্বারে অতিরিক্ত রোগী সর্বরাহ করেন। হাসপাতালে আসা রোগীরা জানান “প্রাথমিক ও জরুরী চিকিৎসা” সেবা ছাড়া জটিল কিছুুর জন্য বেশির ভাগ রোগীকে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়। অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসক না থাকায় এবং সন্তান সম্ভবা নারীদের জন্য গাইনী কনসেলটেন্স ও সার্জারী কনসেলটেন্স এই হাসপাতাল প্রযোজ্য নয়। জরুরী বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা পাওয়া গেলেও চিকিৎসক না থাকায় নির্ধারিত সময়ে আউটডোরে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় না।

 

এ দিকে বিগত কয়েক বছরের বেশি সময় ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে ২ টি অ্যাম্বুলেন্স ও ২ টি টিউবওয়েল। ফলে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও স্বজনদের বাইরে থেকে পানি কিনতে হয়। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও নাজুক। জরুরী বিভাগে প্রায় নার্স-ব্রাদার, মেডিকেল এসিসটেন্টের পরির্বতে আয়া দিপাল মজুমদার, সুইপার সমীরন, সুকুমার এবং নাইট র্গাডদের মাধ্যমে সেলাই, ব্যান্ডেজ বা ডেসিং করতে দেখা যায়। এ ছাড়া হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ময়লা আবর্জনার স্তুপ। হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে গেলে দেখা যায় ভর্তিকৃত রোগীদের করুণ দশা। অনেকেই সীট না পেয়ে হাসপাতালের বারান্ডায় চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যদিকে লোডংশেড়িংয়ের কারণে রোগীরা গরমে অতিষ্ট। ১টি জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি বরাদ্দ না থাকার অজুহাত দেখিয়ে লোডশেডিংয়ের সময় দেখা যায় জেনারেটর বন্ধ।

অচল হয়ে পড়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স

অচল হয়ে পড়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স

সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধানকালে কয়েক জন রোগীদের সাথে আলাপ কালে জানা যায়, সরকারী হাসপাতালে এক্স-রের সেবা ১দিন দেওয়া হলেও বেশি ভাগ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধন ফটকের বাইরে বিভিন্ন ল্যাব এ ২০০ থেকে ৬০০ শত টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আমাদের বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকেই কিনতে হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা জলদী গ্রামের আয়েশা খাতুন জানান, তিনি ৪৫০ টাকা দিয়ে বুকের এক্স-রে করিয়েছেন। কালীপুর ইউনিয়নের পূর্ব পালেগ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আছিয়া খাতুন জানান, গরীব রোগী’রা বাইরে থেকে ছড়া দামে এক্স-রে করতে না পেরে ধুকে ধুকে মরছে। কোকদন্ডী গ্রামের মো. ছৈয়দুল আলম জানান, সরকারী হাসপাতালে যা স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার কথা তা এই হাসপাতালে রোগী’রা পায় না। এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসকদের গ্রামে থাকতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিদেশ দিলেও বাঁশখালী হাসপাতালে কর্মরত অধিকাংশ চিকিৎসক চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা-যাওয়া করে। ফলে সকাল ৮টায় হাসপাতালে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও নির্ধররিত সময় উপস্থিত হতে পারেন না। চিকিৎসকরা প্রতিদিন অফিস করার নিময় থাকলেও অনেকেই অফিস করেন না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন হাসপাতালটি পরির্দশনে গেলে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক’রা উপস্থিত না থাকায় ৭ জনকে মৌখিক ভাবে সর্তক করে দেন। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে প্রতিনিয়ত জমে থাকে ময়লা পানি। হাসপাতালের চার পাশে ময়লা-আবর্জনা ভরে থাকলেও কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না।

 

রোগী নিয়ে বহিরাগত দালালদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় গত ২৫ ফেব্র“য়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযানে কালে ৩ জন দালাল কে ধরে জেল পাঠান। এরা কয়েক জন চিকিৎসাকদের দালালা হয়ে রোগীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। মূলত চিকিৎসক’রা দালালদের কমিশনের মাধ্যমে রোগী আনেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের পাশাপাশি ল্যাবের পক্ষে ১০/১২ দালাল সর্বক্ষনিক হাসপাতালের ভিতরে চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে ঘুরতে দেখা যায়।

 

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডা: সাইফুল ইসলাম বলেন, এই হাসপাতালের জন্য কম পক্ষে আরো ২টি অ্যাম্বলেন্স দরকার। একটি দিয়ে কাজ চালানো অসম্ভব। দালালদের শীঘ্রই অভিযান পরিচালানার মাধ্যমে তাদের বিরোদ্ধে আইনগত ব্যবস্বা নেওয়া হবে। এ ছাড়া চিকিৎসকসহ জনবল সংকটও বিষয়টি উপর মহলে জনানো হয়েছে।

মতামত.........