,

বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জমি জবর দখলের অভিযোগ

ভুমি মালিকদের বিক্ষোভ সমাবেশ, অবিক্রিত জমিতে কাজ বন্ধ রাখার দাবি।

মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ-
চট্রগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বহুল আলোচিত-সমালোচিত ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবারো  ভুমি জবর দখলের বিরুদ্ধে স্হানীয় জনসাধারণের এস আলম গ্রুপের  কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ফের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ওয়াকফ ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি না কিনে জমি ভরাট শুরু করায় নতুন করে এই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

জায়গা জবর দখলের অভিযোগে ভুমি মালিকদের এক প্রতিবাদ সভা গত ১৬ অক্টোবর (সোমবার) দুপুর ১ টার দিকে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ইউনিট-২ আলোকদিয়া এর নির্ধারিত জায়গা অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকার জমিদার বাড়ির ভুমি মালিক গন্ডামারা বড়ঘোনা ইউনিয়ন অাওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও রুবেল উদ্দীন চৌধুরীর সঞ্চলনায় অনুষ্ঠিত উক্ত প্রতিবাদ সমাবেশে ভুমি মালিকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন, গন্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কুতুব উদ্দিন চৌধুরী, জামাল উদ্দিন চৌধুরী, অাতিক চৌধুরী, অালী হায়দার চৌধুরী অাসিফ, দিনার উদ্দিন চৌধুরী সহ অনেকে।

বিক্ষোভ সমাবেশের ব্যানারে উল্লেখ করা হয়, ‘এলাকার জনগণের ন্যায্য দাবী আদায় এবং অবিক্রিত জায়গা ও পেটান আলী চৌধুরী, মকবুল আলী চৌধুরী ওয়াকফ্ স্টেট এর জায়গায় মাটি ভরাট ও অবৈধ জবর দখলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ।

প্রতিবাদ সভায় বক্তরা বলেন, অামাদের এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, এলাকার গরীব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, এলাকায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিতে অামরা নিজেদের বাপ-দাদার পৈতৃক জমি বিক্রয় করে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম থেকেই সহযোগিতা করে এসেছিলাম। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অামাদের সে ত্যাগ  কর্তৃপক্ষ ভুলে গিয়ে অামাদের সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নতো দুরের কথা,আরো উল্টো আমাদের জায়গা নিয়ে জবর দখল করা হচ্ছে। গন্ডামারা ইউনিয়নের জনসাধারণ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পক্ষে। কিন্তু অবিক্রিত জমির মূল্য পরিশোধ না করে প্রকল বাস্তবায়ন করছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কতৃপক্ষ। তারা ভূমির ন্যায্য মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের করতে বলেন। অবিক্রিত জমির মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত এসব এলাকায় কাজ বন্ধের অনুরোধ জানান।

অালেকদিয়ায় অল্পকিছু জায়গা ক্রয় করে ইদানিং অামাদের অবিক্রিত জায়গা অনেকটা জবর দখল করে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। যা সম্পুর্ণ বেঅাইনী। এব্যাপারে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কর্তৃপক্ষের কাঁছে অভিযোগ জানানো হলেও তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ না করে কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশিমত কাজ করে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অামরা ভূমির মালিকরা তা চোখ বুঝে দেখে থাকার কোন যৌক্তিকতা নেই, অামরা এখন থেকে অামাদের জমির মালিকানা ধরে রাখতে এবং পাশাপাশি অামাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজনে জিবন দিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের  কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হব। তাদের দাবী মানা না হলে পরবর্তী কর্মসূচী হিসেবে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি এবং আমরণ অনশনের কথা উল্লেখ করেন।

অবিক্রিত জমি মালিকদের পক্ষে প্রধান সমন্বয়ক দিনার উদ্দিন চৌধুরী তার বক্তৃতায় বলেন, ‘দলিলভুক্ত  মকবুল আলী চৌধুরী ওয়াকফ স্টেট ও পেটান আলী চৌধুরী ওয়াকফ স্টেটের ৪৬০ একর এবং বিভিন্ন মানুষের আরও ২৫০ কানি অবিক্রীত জমি অবৈধভাবে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।
সর্বমোট প্রায় ৮ শত কানি জমির মূল্য এখনও পরিশোধ করা হয়নি।উক্ত জায়গা গুলোর মূল্য পরিশোদের কথা বলা হলেও তা অদৃশ্য কারণে করা হচ্ছে না। বরং এসব জায়গায় জোর করে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় দখলে থাকা জেলে ও কৃষকদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে গন্ডামারা ১ নং ওয়ার্ডের মৃত হাজী আহমদ কবিরের পুত্র আবুল বাশার বলেন, আমার পরিবারের মূল খতিয়ান ভুক্ত “১০ খানি ১১”গন্ডা জমি আমরা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিক্রিয় করেছি,কিন্তু উক্ত জায়গার খাস মাথা খিলা আমাদের আরো “৩ খানি ৬ গন্ডা “মত জায়গা রয়েছে।তাদেরকে কাগজ পত্র জমা দিলেও এখন ও পযর্ন্ত আমাদের কে আজ নয় কাল  বিভিন্ন টালবাহানা দিয়ে ঘুরাচ্ছে।

একই এলাকার মৃত আমির আলীর পুত্র আলমগীর বলেন,আমি এবং আমার পরিবার আবাইত্যা ঘোনা এলাকায়  কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কে  ১৪ খানি বিক্রিয় করেছি,আরো নাল জায়গার  মাথা খিলা খাস “সাড়ে ৪ খানি” জায়গা এখনও রয়েছে, তবে ওই “সাড়ে ৪ খানি “জায়গার কোন মূল্য আমাদের দেওয়া হচ্ছে না।

একই অভিযোগে মৃত হাজী আসহাব মিয়ার পুত্র মোঃ আব্দুল বলেন,আমি আবাইত্যা ঘোনাতে “সাড়ে ৩ খানি”কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিক্রিয় করেছি।আরো মাথা খিলা খাস “দের খানি” রয়েছে। এখন ও পযর্ন্ত তারা আমাদের মূল্য না দিয়ে বিভিন্ন ভাবে ঘুরাচ্ছেন।

কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে বর্তমানে দায়িত্বরত দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্টান  এস আলম গ্রুপের নিয়োজিত  আইন উপদেষ্টা মোঃ হুমায়ন কবির বলেন, আমরা এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ইতি মধ্যে প্রকল্প ইউনিট -১ মেইন প্রজেক্টে ১৯০ একর, মেইন জেটিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৪০ একর ও প্রকল্প ইউনিট-২ (আলকদিয়া)  এলাকার জন্য ৭২ একর সবর্মোট ৩০২ একর  জায়গা খরিদ করেছি।

জায়গা খরিদ না করে  জবর দখলের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আলকদিয়া,পশ্চিম বড়ঘোনা, চর বড়ঘোনা মৌজায় মকবুল আলী চৌধুরী ওয়াকফ স্টেট ও পেটান আলী চৌধুরী ওয়াকফ স্টেটের ৪৬০ একর এবং বড়ঘোনা জমিদার বাড়ির বিভিন্ন ব্যক্তির ২৫০ খানি অবিক্রিয় কৃত জায়গা জবরদখল করে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বর্ধিত অংশ ভরাট করা হচ্ছে যে অভিযোগে বিক্ষোভ করছে  তা আমরা জানি না।আমাদেরকে কেউ কখন ও এ বিষয়ে জানাই নি।তাদের যদি সটিক কাগজ পত্র থাকে তারা আসুক, যদি এই প্রকল্পের জন্য উক্ত জায়গা গুলো প্রয়োজন হয় তখন আমরা কাগজ পত্র দেখি কোন একটা ব্যবস্থা গ্রহন করব।কৈই কেউ তো  আজকের দিন পযর্ন্ত উক্ত ওয়াকফ স্টেট ও জমিদার বাড়ির কারো কোন জায়গার বিষয়ে আমাকে কেউ বলেনি।কিন্তু কেন সটিক কাগজ পত্র থাকলে প্রকল্প এলাকায় এসে কথা বলুক, আমরা কাগজ পত্র দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করব। এ প্রকল্প কোন ব্যক্তির নয়, এটি একটি চীন এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ প্রজেক্ট। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে   বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নশীল এলাকায় পরিনত হবে এই গন্ডামারা বড়ঘোনা এলাকার সাধারন জনগন।২০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষের সবার জীবনে পরিবর্তন আসবে।  এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে স্কুল, কলেজ,মসজিদ, মাদ্রাসা,  হাসপাতাল সহ আরো উন্নয়ন মূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হবে, আর এই কাজগুলো করবেন এই এলাকার সাধারন জনগণ ।  আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরো এলাকায় পরিবর্তন হয়ে যাবে, এজন্য অত্র এলাকার সাধারন জনগণের  ভূমিকা অপরিসীম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাঁশখালীতে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম হবে।  আমার দীর্ঘ ৩০ বছরের জীবনে দেখেছি এই এলাকার কোন উন্নয়ন হয়নি, কেউ মাছ ধরছেন আর কেউ কৃষি কাজ করছেন, একটি স্কুল হয়নি, কলেজ হয়নি, কোন হাসপাতালও নেই, অথচ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এখানকার চেহারা পাল্টে যাবে।

কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় কেউ সন্ত্রাস করতে চাইলে এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইলে তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে এমন হুশিয়ারি উচ্চরণ করে বাঁশখালী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি)আলমগীর হোসেন বলেন, জমি জবর দখলের যে  অভিযোগটি  করা হচ্ছে তা নিয়ে গত ১৬ অক্টোবর (সোমবার) রাতে এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিনিধি দল এবং অবিক্রিয় কৃত ভূমির মালিকদের নিয়ে আমি বাঁশখালী থানায় একটি বৈঠক করি।উক্ত বৈঠক অবিক্রিয় কৃত ভূমি মালিকদেরকে আগামী একমাসের মধ্যে কাগজ পত্র দেখানোর জন্য বলা হয়েছে।কাগজ পত্র যাচাই বাচাই করে যে কোন একটা ব্যবস্হা গ্রহন করা হবে। আশা রাখি এই সমস্যাটা খুব শীগ্রই সমধান হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, এ প্রকল্প কোন ব্যক্তি বিশেষের নয়, এটি একটি চীন এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্টান এস আলম গ্রুপের  যৌথ প্রজেক্ট। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে  বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নশীল এলাকায় পরিনত হবে এই বাঁশখালী। সরকার যে কোন মূল্য এই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করবে। ২০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষের সবার জীবনে পরিবর্তন আসবে।সুতারাং সরকারী এই প্রকল্পের কাজে বাধা না দিয়ে সকলের আন্তরিকতা প্রয়োজন।

মতামত.........