মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি-

দেশের ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ও নৃশংস ঘটনার পর বাঁশখালীর ১১হত্যার বিচার দীর্ঘ ১৪বছর পেরিয়ে গেলেও কোন কূল কিনারা হয়নি এ মামলার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাধনপুর শীলপাড়ায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এই ঘটনায় ৪ দিনের শিশু কার্তিকসহ ১১জনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা। হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতের হাই কমিশন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে আসলেও এখন কেউ খবর রাখে না বলে অভিযোগ করেছেন খোদ মামলার বাদী ডাঃ বিমল শীল।

শনিবার (১৮নভেম্বর) এ হত্যাকান্ডের ১৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে নিহত ১১জনের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবির পাশাপাশি সামপ্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান সিপিবিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

ঘটনার পর তেজেন্দ্র শীলের ছেলে বিমল শীল বাদি হয়ে মামলা করেন।

সাত তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে অষ্টম তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার হ্লা চিং প্রু ২০০১সালের ৯জানুয়ারি ৩৯জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এরপর ওই বছরের ১২সেপ্টেম্বর ৩৮জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। এতে ডাকাতির উদ্দেশ্যে অগ্নি-সংযোগ, খুন ও লুটতরাজের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।

এদিকে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার অগ্রগতি হচ্ছে না। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৩ এ গত ১৪ বছরে ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৯ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যেই মামলার কার্যক্রম আটকে রয়েছে। ফলে মামলার ভবিষ্যত্ নিয়ে সন্দিহান মামলার বাদীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

স্হানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০৩সালের ১৮নভেম্বর গভীররাতে সাধনপুর ইউনিয়নের শীল পাড়ায় ডাকাতরুপী একদল নরপশু একই পরিবারের ১১জন সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যা করে। এই ঘটনার পর নিহত পরিবারের সদস্য ডা. বিমল শীল বাদি হয়ে বাঁশখালী থানায় মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটি ১১বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলমান রয়েছে। মামলার দিন ধায্য করা হয়েছে।

একই পরিবারের নিহত সদস্যরা হলেন তেজেন্দ্র লাল সুশীল (৭০), বকুল বালা শীল (৬০), অনিল কান্তি শীল (৪২), স্মৃতি রানী শীল (৩০), সোনিয়া শীল (৭), রম্নমী শীল (১১), বাবুটি শীল (২৫), প্রসাদী শীল (১৭), এ্যানী শীল (১৫), দেবেন্দ্র শীল (৭০) ও ৪ দিনের শিশু কার্তিক।

সর্বশেষ ২০১০সালে সিআইডি দপ্তর চট্টগ্রাম হতে এই মামলায় ৩৮জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্র আদালতে গ্রহণের পর শুনানি শেষে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এরই মধ্যে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা ও সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর চাচাত ভাই কালীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান চৌধুরী উচ্চ আদালতে মামলার কার্যক্রম স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেন। এখনও পর্যন্ত যার কোনো সুরাহা হয়নি। অভিযোগপত্র বিভিন্ন সময় পরিবর্তন করা হয় আসামিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে।চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

২০১১সালের ৯ জানুয়ারি ৩৯জনকে আসামি এবং ৫৭জনকে সাক্ষী করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির এএসপি হাচিং প্র“। পরে এক আসামিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়ায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮জনে।
তারা হলেন- আবদুল করিম ওরফে কালা করিম, জাবেদ হোসেন, আহম্মদ মিয়া ওরফে তোতাইয়া, মাহবুবুর রহমান ওরফে মাহবুব আলী, মো. হাসান ওরফে আর্মি হাসান, সরওয়ার উদ্দিন, মো. শাহজাহান, আবু তৈয়ব, আকবর ওরফে আকবর আলী, শাহজাহান ওরফে দুলা মিয়া, আমিনুল হক, আহম্মদ হোসেন, মতলব, শফিউল আজম, জসিম, নজরুল ইসলাম, আমিনুর রহমান চৌধুর, আমিনুল হক, আনু মিয়া, সেলিম, বক্কর, রুবেল, আবু, অজি আহম্মদ, আজিজ, আজগর ওরফে রুবেল, জসিম, এনাম, লেদু, কামরুল ইসলাম, আমির হোসেন, ইউনূছ, আবুল কালাম, নূরুন্নবী ওরফে কালাইয়া, মেম্বার রশিদ আহম্মদ, আবদুল নবী এবং চেয়ারম্যান সবুর আহম্মদ।

সর্বশেষ এই মামলায় ৩৮জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডি অভিযোগপত্র দিলেও বিভিন্ন মহলের তদবিরে নজরুল ইসলাম নামে এক আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এই মামলা থেকে, এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় এ মামলার আসামি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান চৌধুরী বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়নি।এবং উক্ত মামলায়  চার চার বার চার্জশিট থেকে তার নাম অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও ১১হত্যার বিচারের ব্যাপারে আদৌ হাল ছাড়েননি মামলার বাদী।

শনিবার সকাল ১১ঘটিকায় ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ও স্মরণসভা বাঁশখালী থানা আওয়ামীলীগের সহ- সভাপতি পুলিন শীল এর সভাপতিত্বে অন্যান্যেদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাঁশখালী থানা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল গফুর, থানা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সসম্পাদক অধ্যাপক বিকাশ রঞ্জন ধর, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধনপুর ইউপির চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন চৌধুরী খোকা, ন্যাপ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি ও ১৪ দলের সম্বনয়ক ডাঃ আশীষ শীল, শীল কল্যান সমিতির বাঁশখালী থানার সাধারন সম্পাদক সুনীল শীল, সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাষ্টার খোকন, বাঁশখালী থানা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি প্রদীপ গুহ, ১১ হত্যা মামলার বাদী বিমল শীল, সাধনপুর ইউনিয়ন আওয়িমীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদৌসুল হক প্রমুখ।

স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, বীভৎস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। এতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বাড়ছে।
এ সময় তারা এদেশ হতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবানও জানান। তাছাড়া মৃত্যুবার্ষিকীতে অংশগ্রহণ করেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্ঠান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দরা।

ন্যাক্কারজনক ও নৃশংস বাঁশখালীর  ১১ হত্যার মামলার বাদী ডাঃ বিমল শীল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় নৃশংস মামলাটি ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আমি কোন বিচার পাইনি।আমি দীর্ঘ এই মামলাটি পরিচালনা করার জন্য ১০-১৫ লক্ষ টাকা খরচ করেছি, কিন্তু আমাকে স্হানীয় সংসদ সদস্য এবং থানা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে কোন সাহয্য সহযোগিতা করেন নাই, আমার মামলাটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষ পাতিত্ব করার কারনে বর্তমানে আমি অর্থিকভাবে ও দূর্ভল হয়ে গেছি। এ মুহুর্তে মামলাটি পরিচালনা করা আমার পক্ষে আর সম্বভ হচ্ছে না।

তিনি কন্নাজড়িত কন্ঠে আরো বলেন, আমি আমার ছেলে মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করছি খুব কষ্ট করে, এত বড় মামলা আমি অথচ কারো কাছ থেকে কোন হেল্প পাচ্ছি না ,সেদিন ১১হত্যার মত আমি ও মরে গেলে ভাল হত। বাঁশখালী পূজা উদ্যাপন পরিষদের পক্ষ থেকে এই নারকীয় হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার দাবী করেছেন। এরপর ওই বছরের ১৯এপ্রিল এ হত্যা মামলায় ৩৮আসামির বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ গঠন করে আদালত। সেই থেকে মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।

দীর্ঘ ১৪বছরেও বাঁশখালীর ১১হত্যা মামলার কুল কিনারা হয়নি

মতামত.........