এই লেখাটি উমের তাসপিনারের  “দ্য ইসলামিস্ট আর কামিংঃ হু দে রিয়েলি আর” নামক বইয়ের একটি অধ্যায়ের অনুবাদ। বইটি উইলসন সেন্টার এবং ইউ এস ইন্সটিটিউট অফ পীস কর্তৃক একটি যৌথ প্রকাশনা।

imagesহাসান রাইয়ান:
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সাতান্নটি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে তুরস্কের মডেলটি রাজনৈতিক ইসলামের ক্ষেত্রে (তর্ক সাপেক্ষে) সবচেয়ে ডাইনামিক অভিজ্ঞতা। ওসমানী খেলাফতসহ আরো অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ইতিহাস সত্ত্বেও, পূর্ণবিকাশ সাধনের ক্ষেত্রে এটি আরব বিশ্বের জন্য অনেক দৃষ্টান্তমূলক প্রস্তাবনা বহন করে। ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর অনিচ্ছুক স্বীকৃতির সামঞ্জস্যতা খুঁজে পেতে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি একেপিকে পাঁচটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
একেপি’র এই বিবর্তনে প্রমাণ হয় যে, তুরস্কের মত একটি ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশে কিভাবে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক ইসলামের সাথে পরস্পর কাজ করতে পারে। তুরস্কের ইসলামী দলগুলো নির্বাচনী এবং পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে একধরণের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তুরস্কের মিলিটারি কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া কট্টরপন্থী ইহজাগতিকতাবাদ (সেক্যুলারিজম) একসময়কার অনমনীয় ধর্মীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে আরো নমনীয় করেছে। পূর্বেকার কর্মপদ্ধতি ইসলামী রাজনীতিকদেরকে অনেক সমস্যায় ফেলেছিল। তাদের অনেককে কারাবরণও করতে হয়েছিল। একেপি একটি রাজনৈতিক দল যার শেকড়টা পরিষ্কারভাবেই ইসলামের সাথে সংযুক্ত। পূর্বের নিষিদ্ধ দল থেকে বেরিয়ে এসে এক যুগের মধ্যে এটি প্রায়োগিকভাবে নিজেকে ডান কেন্দ্রিকতাতে (সেন্টার রাইট) স্থানান্তর করেছে। যদিও আদর্শিক বিষয়াদির সাথে দলটির সফলতার সম্পর্ক খুব সামান্যই ছিল। তুরস্কের ভোটাররা রুটি রুজির ব্যাপারেই বেশি চিন্তিত ছিল।
দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি সাধন এবং উন্নত সামাজিক সেবা প্রদান বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও আবাসন ক্ষেত্রে অবদান রাখার প্রতিদানস্বরূপ তারা রজব তৈয়ব এরদোগানকে ২০১১ সালের জুলাই মাসে পুনর্নিবাচিত করে। একেপির বিজয় ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৪৬ সালে তুরস্কের বহুদলীয় গণতন্ত্র শুরু হওয়ার পরে একটি রাজনৈতিক দলের জন্য পর পর তিনবার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার এটি মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা। এবং এটিই ছিল সর্বপ্রথম ঘটনা যেখানে একটি দল তার প্রত্যেক পূর্ববর্তী নির্বাচন থেকে নতুন নির্বাচনে ভোটের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। ২০০২ সালের নির্বাচনে একেপি ৩৪.২৮ শতাংশ, ২০০৭ সালের নির্বাচনে ৪৬.৫৮ শতাংশ এবং ২০১১ সালের নির্বাচনে ৪৯.৯০ শতাংশ ভোট অর্জন করে। এটা তুরস্কের রাজনৈতিক সমীকরণকেও উল্টে দিয়েছে। তুরস্কের পূর্ববর্তী সব ইসলামী দল হয় মিলিটারি কর্তৃক নয় সাংবিধানিক আদালতের রায়ে নিষিদ্ধ হয়েছে: ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল অর্ডার পার্টি ১৯৭১ সালে সাংবিধানিক কোর্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৮০ সালের সামরিক ক্যু এর পরে আইনত নিষিদ্ধ হয়। দ্য ওয়েলফেয়ার পার্টি ১৯৮৩ তে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাংবিধানিক আদালতের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে নিষিদ্ধ হয়। দ্য ভার্চ্যু পার্টি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ২০০১ সালে নিষিদ্ধ হয়। তুরস্কের রাজনীতির বিবর্তনে এই অধ্যায়গুলো বেশ প্রনিধানযোগ্য কারণ প্রতিবার নিষিদ্ধ হওয়ার পরে সে দেশের ইসলামী দলগুলো আরো মডারেট ও আরো প্র্যাগমাটিক ভাবে নিজেদের আবির্ভাব ঘটিয়েছে।
1468983745
২০০৮ এ দ্যা ইকোনোমিস্ট এর মতে “মুসলিম রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো প্রায়শই ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে, যা পরে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় এবং সহিংসতায় রূপ নেয়। সেক্ষেত্রে তুরস্কের ইসলামপন্থীরা ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। বার বার নিষিদ্ধ হওয়া এবং ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও ধার্মিক রাজনীতিকরা সহিংসতা থেকে দূরে থেকেছে, গণতন্ত্রকে আঁকড়ে থেকেছে এবং মূলধারার রাজনীতির দিকে এগিয়ে গেছে। কোন ইসলামী দলই একেপির মতো এত মডারেট ও পশ্চিমা-বান্ধব ছিল না। যেমন একেপি ২০০২ সালে তুরস্ককে ইয়োরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশ্বাসে সরকার গঠন করেছে”। একেপির প্রতিষ্ঠাতা এরদোগান মূলত তার দলকে ধর্মীয় পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ২০০৫ সালে বলেন “আমরা ইসলামী দল নই, এবং আমরা ‘মুসলিম-ডেমোক্র্যাট’ লেবেলকেও প্রত্যাখ্যান করি”। তদস্থলে একেপির এই নেতা তার দলের এজেন্ডাকে “রক্ষণশীল গণতন্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করাকে পছন্দ করেন।
রাজনৈতিক ইসলাম থেকে রক্ষণশীল গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে একেপি’র যাত্রাটা শুধুই রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জন অথবা তুর্কি ইহজাগতিকতাবাদ আরোপিত বাধ্যবাধকতার ফলাফল নয়। ১৯৮০ সালে তুরগুত উজালের নেতৃত্বে তুর্কি পুঁজিবাদের বিকাশের সময় সে দেশের তদানীন্তন প্রাণকেন্দ্র আনাতোলিয়ায় একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম উদ্যোক্তা শ্রেনী তৈরি করেছিল। রাজনীতিতে এই নতুন মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ফলত তারা আরও সম্পৃক্ত হয়ে যায়। এইসব “ইসলামী ক্যালভিনিস্টরা” ইসলামী আইন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী উপস্থাপনার চাইতে মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে প্রবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি বেশি উৎসাহী ছিলেন। তুরস্কে এখন এরকম হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের রপ্তানিমুখী ব্যবসায় আছে যাদেরকে প্রায়শই আনাতোলিয়ান টাইগার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এদের অধিকাংশই একেপিকে সমর্থন করে। ১৯৯০ এর শুরু থেকে এই দলের রাজনৈতিক ক্ষমতা-সম্পর্ক সম্বন্ধীয় ধারণা তুরস্কের রাজনৈতিক ইসলামের রক্ষণশীল চিন্তাধারাকে ধীরে ধীরে সহনশীল করেছে। একেপির নেতৃত্ব দলটিকে স্পষ্টতই অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর জন্য মডেল হিসেবে দেখে।
180926turkey_army_kalerkantho_pic
২০১১ সালের ১২ই জুন এরদোগান একেপির ভূমিধ্বস বিজয় উদযাপনকারী হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন আজ সারাজেভো ইস্তাম্বুলের মতই জয়ী হয়েছে। বেইরুত জয়ী হয়েছে ইজমিরের মতো, দামেস্ক জয়ী হয়েছে আংকারার মতো। রামাল্লা, নাবলুস, জেনিন, পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেম জয়ী হয়েছে যতটুকু জয়ী হয়েছে দাইয়ারবাকির।
অনুবাদ : হাসান রাইয়ান, কোনিয়া, তুরস্ক থেকে, শিক্ষার্থী ও লেভেল, উলুসলারারাসি মাওলানা আনাদলু ইমাম হাতিফ লিসেসি মাদ্রাসা, তুরস্ক।
ইমেইল : hassanrayaan@hotmail.com
সম্পাদনায় : আবদুল আউয়াল জনি
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখা লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত এর কোন দায়ভার সংবাদ সবসবসময় কতৃপক্ষ বহন করবেনা, লেখকের মতের সাথে সংবাদ সবসবসময় কতৃপক্ষের মতের মিল নাও থাকতে পারে…………
তুরস্কঃ একটি নতুন মডেল, মুক্তমত + সম্পাদকীয়

মতামত.........