,

জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প: প্রভাষ আমিন

প্রভাষ আমিন:

এবারের ঈদ বাংলা নাটকের বাক বদলের ঈদ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কী মঞ্চনাটক, কী টেলিভিশন নাটক- দুই ক্ষেত্রেই এবার দারুণ আলোড়ন। শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে ‘রিজওয়ান’ তো রীতিমত সুনামী বইয়ে দিয়েছে। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর আর কোনও মঞ্চনাটক নিয়ে এমন তোলপাড় হতে দেখিনি। টেলিভিশনের অবস্থা তো আরও করুণ। আগে যখন একমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল, তখন এ সপ্তাহের নাটক প্রচারের সময় রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। নাটকের অভিনেতার ফাঁসির প্রতিবাদে রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে, নাট্যকারকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে, এই বাংলাদেশেই। সেই দিন কবে ফুরিয়েছে। এখন ২০টি চ্যানেলে গণ্ডায় গণ্ডায় নাটক প্রচারিত হয় প্রতিদিন। ঈদ এলে তো প্রচারিত হয় কয়েক শ’ নাটক। কিন্তু হায় দেখার লোক নেই। ভারতের নানা চ্যানেলের নায়ক-নায়িকারা, তাদের পোশাক নিয়ে রীতিমত ক্রেজ তৈরি হয় বাংলাদেশে। তবে এবার ঈদে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। এক যুগ পর সৈয়দ জামিল আহমেদের মঞ্চে আসা নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল তৈরি হয়। ‘রিজওয়ান’ দিয়ে সেই কৌতুহলের দারুণ জবাব দিয়েছেন তিনি। ‘রিজওয়ান’এর গল্প কেন কাশ্মিরের যুবককে নিয়ে, এ বিষয়ে কারও কারও প্রশ্ন থাকলেও নাটকের প্রোডাকশন নিয়ে সবাই উচ্ছ্বসিত।

এবার টিভি নাটকেও উচ্ছ্বাসের ঢেউ। বাংলাদেশের নাটক দিয়ে ক্রেজ সৃষ্টি করেছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। এবার তার ছেলে নুহাশ হুমায়ুনের নাটক ‘হোটেল অ্যালবাট্রস’ নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন অনেকে। তবে অনেকদিন পর মধ্যবিত্ত বাঙালির আবেগের নদীতে ঢেউ তুলেছেন তরুণ মিজানুর রহমান আরিয়ান। তার বানানো ‘বড় ছেলে’ কাঁদিয়েছে অনেককে।

নাটক নিয়ে এত কিছু বললাম বটে। তবে কিছুই আমার দেখা হয়নি। আমার সব প্রতিক্রিয়া সামাজিক মাধ্যম থেকে পাওয়া। নাটক দেখি না, এমন উন্নাসিক আমি নই। একসময় নিয়মিত টিভি নাটক তো বটেই, মঞ্চনাটকও দেখেছি। এখন ব্যস্ততা্র কারণে নাটক দেখা হয় না। এখন নাটক সেই আকর্ষণও তৈরি করতে পারে না। আর এবারের ঈদে আমরা মানে সংবাদকর্মীরা টেলিভিশন নাটক নয়, ব্যস্ত ছিলাম জীবন নাটক নিয়ে। টেকনাফে প্রতিদিন মানবতা কেঁদে মরছে। জীবনের গল্প যেন অল্পই বাকি আছে সেখানে।

বলছিলাম নাটক ‘বড় ছেলে’র কথা। আমি নিজেও সংসারের বড় ছেলে। নাটকটি না দেখলেও বড় ছেলের দায়িত্বটা জানি। তবে নাটকের বড় ছেলের চেয়েও বাস্তবের বড় ছেলের দায়িত্ব অনেক বেশি। এই যেমন এই ছবিটি দেখুন। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা একটি রোহিঙ্গা পরিবারের ছবি। পরিবারের কর্তা হয়তো মরে গেছেন, ভেসে গেছেন বা হারিয়ে গেছেন। মা তার তিন সন্তানকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। এই পরিবারের বড় ছেলেটির বয়স কত হবে, ৭ বা ৮? ভাবুন তো, আপনার এই বয়সের সন্তান কীভাবে চলাফেরা করে? বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো এই দুর্গম পথে সে বাবার কোলে চড়েই যেত। কিন্তু এই শিশুটি পরিবারের বড় ছেলে। বাবার অনুপস্থিতিতে তার ছোট্ট কাঁধে এখন পুরো পরিবারের ভার। দেখুন এমন কর্দমাক্ত পথ শিশুটি পাড়ি দিচ্ছে তার ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে। অত ছোট কাঁধ বহন করছে কত বড় দায়িত্ব!  শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে আসে। সিনেমায় দেখা যায় ছেলেবেলায় নির্যাতিত হলে বা পিতামাতাকে নির্যাতিত হতে দেখলে সেই শিশু বড় হয়ে প্রতিশোধ নেয়। আর এই শিশুটির চোখের সামনে একটি গোটা জাতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা হচ্ছে। সিনেমার গল্পের মতো এই ছেলেটি যদি বড় হয়ে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, আপনারা নিশ্চয়ই তাকে সন্ত্রাসী বলে গুলি করে মেরে ফেলবেন।

গত বছরের অক্টোবরে এবং গত ২৫ অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর যে নির্বিচার গণহত্যা চলছে, তার নানান ছবি সামাজিক মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে ঘুরছে। এরমধ্যে কিছু মিথ্যা ছবিও ঢুকে পড়েছে। অনেকে পুরোনো ভূমিকম্প নিহতদের লাশের সারি বা পুরোনো আগুনের ছবি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। এতে রোহিঙ্গাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। কারণ একটা মিথ্যা ছবি পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ম্লান করে দিতে পারে। মিয়ানমার সেই মিথ্যা ছবির সূত্র ধরে পুরো পরিস্থিতিকেই অস্বীকার করার চেষ্টা করতে পারে এবং করছেও। তাই গণমাধ্যম এবং বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুর ছবি প্রকাশের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা দরকার। রাখাইনে যা হচ্ছে, কোনও ছবি দিয়েই তার ভয়াবহতা বোঝানো সম্ভব না। মিয়ানমার সরকার পুরো একটা জাতিকে মেরে, পুড়িয়ে, তাড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। সেখানে যেহেতু গণমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক কোনও সংস্থার প্রবেশাধিকার নেই, তাই সেখানকার সত্যিকার চিত্রটা জানা মুশকিল। কিন্তু যারা পালিয়ে এসেছে, তাদের কাছ থেকে শুনলে বিশ্বের যে কেউ বুঝবেন, রাখাইনে যা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে এই নির্মমতার অন্য কোনও উদাহরণ নেই। দুই সপ্তাহে চার লাখ লোক বাড়িঘর ছেড়ে, শত বছরের শেকড় ছেড়ে পালায় কখন? তারপরও মিয়ানমারের অস্বীকার প্রবণতা আর মিথ্যাচার চলছেই।

বলছিলাম ছবির কথা। রাখাইনে কারও প্রবেশাধিকার নেই বলেই কিছু কিছু ভুয়া ছবি ঢুকে পড়ে বটে। কিন্তু রাখাইনের সত্যিকারের চিত্র সেই ভুয়া ছবির চেয়েও ভয়াবহ। এই স্পর্শকাতরতার কারণে আমি সামাজিক মাধ্যমেও রোহিঙ্গার ইস্যুর কোনও ছবি শেয়ার করার ব্যাপারে সতর্ক থাকি। তবুও এই লেখার সঙ্গে দুটি ছবি শেয়ার করছি। এই ছবিগুলো ফেসবুক থেকে নেওয়া। কে তুলেছেন জানি না, ছবির মানুষগুলোর নাম কি তাও জানি না। কিন্তু আমি জানি এই ছবি দুটি সত্যি। কারণ এরচেয়ে ভয়াবহ সব মানবতার গল্প আমি শুনেছি রিপোর্টারদের মুখে।

এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মুন্নী সাহা চারদিন টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছেন। তার মত শক্ত সাংবাদিকও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। তার রিপোর্ট দেখে অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ঢাকায় ফেরার পর অফিসের সহকর্মীদের অনেকে তাকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছেন। আসলে মুন্নীকে নয়, তারা ছুঁতে চান রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বকে। নিজেদের নির্মমতা ঢেকে রাখতে মিয়ানমার সরকার কাউকে রাখাইন রাজ্যে যেতে দেয় না। কিন্তু মুন্নীর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সীমান্তের ওপারে দিনভর জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। পরিকল্পনা করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। গ্রামগুলো মানুষ শূন্য না হওয়া পর্যন্ত জ্বলছে। দুই সপ্তাহে তিন হাজার মানুষকে মেরেছে তারা। শুধু মারা নয়, মারার ধরণও বিচিত্র। গুলি করে, বোমা মেরে, ছুরি দিয়ে, পিটিয়ে, পায়ে পিষে; নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর টার্গেট। তাদের একমাত্র টার্গেট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। পালাতে গিয়ে অনেকে ডুবে মরেছেন।

একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করেছি, বিপদের সময় মানুষ বদলে যায়, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এমনিতে মানুষ হিসেবে আমাদের অনেক ক্ষুদ্রতা আছে। আমরা প্রতিদিন অনেক অপরাধ করি। কিস্তু বন্যা বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন দুর্গতদের পাশে। টেকনাফ সীমান্তেও বাংলাদেশ প্রমাণ করছে, আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবিক জাতি। দলমত নির্বিশেষে সবাই রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়েছে। একাত্তরে আমরা শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়েছিলাম। আর ২০১৭ সালে আমরা মাত্র দুই সপ্তাহে চার লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছি। আগে থেকেই আছে আরও ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী।

বলছিলাম বিপদের কথা। বিপদে পড়লেই মানুষের ভেতরের মানুষটা আরেও উজ্জ্বল হয়। সাধারণ সময়ে বাংলাদেশের মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে যেমন আচরণই করুক, বিপদের সময় রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়ানোর সময় কিন্তু কিছু ভাবেনি। বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে নানা নেতিবাচক প্রচারণা হয়েছে। তারা মাদক পাচার করে, মানব পাচার করে, সন্ত্রাস করে, ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যায়।বছরের পর বছর টেকনাফ-কক্সবাজারের পরিবেশ ধ্বংস করছে। বন উজার করছে। পাহাড় কেটে বসতি গড়ছে। বদলে দিচ্ছে ঐ এলাকার সামাজিক ভারসাম্য। সব অভিযোগই হয়তো সত্যি। বছরের পর বছর নিগৃহীত, নিষ্পেষিত শিক্ষার আলো বঞ্চিত একটি জাতির মধ্যে অপরাধ প্রবণতা একটু বেশি থাকতেই পারে। টিকে থাকার জন্য তারা নানান চেষ্টা করে। তার মধ্যে বেআইনী তৎপরতাও থাকতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এইসব দেখবে। কিন্তু এখন সময়টা অন্যরকম। এখন সময় নিজেদের আরও ভালো মানুষ প্রমাণের। আর এমন তো নয় যে রোহিঙ্গারা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো মাদকপাচারকারী নেই, সন্ত্রাসী নেই; আমরা পরিবেশ দূষণ করছি না। তবে এতসব অভিযোগ সত্বেও এই সময়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির মানবিকতায় আমি অভিভূত হয়েছি। ছোট ভাইকে কাঁধে করে মাকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাওয়া এই শিশুটির দায়িত্বশীলতার কাছে আমি নত হয়ে যাই। এই যেমন আরেকটি ছবিতে দেখুন, বাবা-মাকে দুই ঝুড়িতে নিয়ে পথ চলছেন এক যুবক। এই যুবকের নাম আমি জানি না। কিন্তু মুন্নী টেকনাফে দেখা পেয়েছিলেন মোহাম্মদ সেলিম নামে আরেক যুবকের। সেলিম তার বৃদ্ধা মাকে কাঁধে করে ১৫ দিন হেঁটেছেন। তার কাঁধে ঘা হয়ে গেছে। কিন্তু মাকে ফেলে আসেননি। এমনিতে যখন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখা, গোয়ালঘরে রাখার নানা খবর শুনি; মন খারাপ হয়ে যায়, মানুষ হিসেবে আমরা খাটো হয়ে যাই। কিন্তু সেলিমদের দেখলে আবার সাহস পাই, বুঝি যে মানুষের মানবিকতা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। সেলিম হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষিত মানুষও লজ্জা পাবে সেলিমের সামনে। রাখাইন থেকে পালানোর সময় এক মহিলা দেখলেন পথের পাশে পড়ে আছে হাতে গুলিবিদ্ধ বছর তিনেকের শিশু জোহরা। সেই মহিলার চার সন্তান। তবুও তিনি সেই অসহায় শিশুটিকে ফেলে আসেননি। মায়ের মমতায় বুকে টেনে নিয়েছেন। জীবন নাটকের নাট্যকার যে বিধাতা পুরুষ, সেই ঈশ্বর হয়তো ভদ্র পাড়ায় থাকেন। কিন্তু টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকে মানুষ। সেই মানুষেরা আমাদের আরও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। টেলিভিশন নাটকের চেয়েও হাজার গুণ মর্মস্পর্শী নাটক প্রতিদিন রচিত হয় ক্যাম্পে ক্যাম্পে।

আছেদুঃখ, আছেমৃত্যু, তবুও রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে রচিত হয় জীবনের জয়গান। বালুখালি ক্যাম্পে রাস্তার ওপরে পলিথিনের আড়ালে এক নারী জন্ম দেন এক শিশুর। ঢাকার অভিজাত হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মায়েদের বাড়ি ফিরতে তিনদিন লাগে। আর সেই প্রসূতি ৫ দিন হেটে বালুখালি ক্যাম্পে এসে সন্তান জন্ম দেয়ার ২০ মিনিটের মধ্যে উঠে দাড়ান, সন্তান কোলে হেসে ওঠেন। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে। এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করার সংগ্রাম করতে থা্কা সবাই সেই মায়ের পাশে দাড়ান। মুন্নী সাহা সেই শিশুর নাম রাখেন প্রথমে বাংলাদেশ, পরে জয়বাংলা।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

probhash2000@gmail.com

সুত্র: বাংলা ট্রিবিয়ন

মতামত.........