,

জঙ্গীবাদ কি জানুন, পরিহার করুন, ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আসুন, মুক্তমত: সাদ চৌধূরী

মো: সাদ চৌধূরী…13735461_880610295382284_2102865431_n

ইসলাম শান্তি, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহানুভূতির ধর্ম। জাতি-ধর্ম, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া, সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের শিক্ষা ই  ইসলাম দেয়। এ ধর্মের বাহক মহানবী (সা:) বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন মৃত্যু পর্যন্ত। তাঁর
উদারতা, সহনশীলতা, পরোপকার অন্যায়ভাবে হত্যাকারী বিশ্বের সবাইকে হত্যাকারী হিসেবে ইত্যাদিতে আকৃষ্ট হয়ে সর্বোপরি ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ
হয়ে তৎকালীন যুগের অগণিত মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে এবং শান্তির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে।

আজো ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধ হয়ে মানুষ দলে দলে ইসলামে যোগ হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপসহ বিশ্বে মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামবিদ্বেষীরা রীতিমতো আতঙ্কিত। তারা ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিপ্রায়ে ইসলামের নামে চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করে ইসলাম ধর্মকে বিতর্কিত করে তুলতে মারিয়া হয়ে উঠেছে। ইসলাম কখনোই চরমপন্থা বা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না। বরং সহিংসতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। হত্যা, রক্তপাত ও অরাজকতা প্রত্যাখ্যান করেছে। পাপ ও নির্যাতনমূলক কাজ থেকে বিরত থেকে সৎ ও ভালো কাজে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে।

চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদের পরিচয় :

চরমপন্থী, চরমপন্থা শব্দগুলো ইংরেজি militant, militancy. শব্দগুলোর অনুবাদ শক্তিমত্ত বা উগ্র বোঝাতেও এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। Oxford Advanced Learner’s Dictionary তে বলা হয়েছে militant. adj. favoring the use of force or strong pressure to achieve one’s aim. …
militant : n. militant person, esp. in politics. Merriam-Wepster’s Collegiate Dictionary তে বলা হয়েছে,
militant 1: engaged in warfare or combat : fighting. 2 : aggressively active (as in a cause). এসব অর্থ কোনোটিই বেআইনি অপরাধ বোঝায় না। কিন্তু আমরা বর্তমানে ‘চরমপন্থী’ বলতে বুঝি রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বেআইনিভাবে নিরপরাধ বা সহজ সরল মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, হত্যা ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত মহল। আর এদের মতবাদকেই আমরা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ বলি।

এই অর্থে প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত পরিভাষা সন্ত্রাস, সন্ত্রাস শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো terror-extreme fear. সন্ত্রাস-এর পরিচয়ে এনসাইকোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, ‘terrorism : the systematic use of violence to create a general climate of fear in a population and thereby to bring about a particular political objective.

সন্ত্রাস :
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষে সুশৃঙ্খলভাবে সহিংসতা ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে সরকার কে অস্থির করে তুলার চেষ্টা। আবার ক্ষমতাশীনদের মতের অমিল একটি  মহল ঐ সন্ত্রাসবাদের অভ্যন্তর জেনে বা না জেনে ঐ কর্মকাণ্ডের স্বামর্থক দ্বাবী করে বসেছে এমন নজিরও বিভিন্ন দেশে হয়ে আছে।তারা বিভিন্ন বক্তব্য মন্তব্যের দ্বারা ঐ স্বামর্থন দেখানোর চেষ্টা করে যদিও এতে কিছু আসে যায় না কোন পক্ষ বিপক্ষের।।

ইসলামের দৃষ্টিতে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ :
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ, এর ভয়াল থাবা আজ বিশ্বকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে ফেলেছে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে একদল চরমপন্থী নির্বিচারে হত্যা, রক্তারক্তি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিশ্বে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলছে। কোনো জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ, মঙ্গলকামী
বক্তব্য যখনই চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদীদের স্বার্থে আঘাত হানছে তখনই সেসবের টুঁটি চেপে ধরতে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত হচ্ছে না তারা। মুসলমানদের চরমপন্থী কিংবা সন্ত্রাসী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও মহানবী সা:-এর ভূমিকা কী? এ প্রসঙ্গে জানার আগে ইসলাম সম্পর্কে কিছুটা জানা প্রয়োজন।

ইসলাম কী? : ইসলামের মর্মবাণী হলো শান্তি ও সাম্য। দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে এবং মানুষে মানুষে শান্তি স্থাপন ইসলামের মূল লক্ষ্য। ইহজাগতিক শান্তির মধ্য দিয়ে পরকালীন শান্তি তথা মুক্তির লক্ষে উপনীত হওয়ার চেষ্টার মধ্যেই ইসলামের সুর ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত। আল-কুরআন ও মহানবী (সা:) প্রচারিত দীনকে বলা হয় ইসলাম। এর অনুসারীদের বলা হয় মুসলিম। সত্যিকার অর্থে মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণই হলো ইসলাম। সাম্য, স্বাধীনতা ও সৌভ্রাতৃত্বের স্লোগান অথবা স্বাধীনতা, সাম্য এবং সুখের অন্বেষণ এসবই গৃহীত হয়েছে ইসলাম থেকে। ইসলাম বিশ্বাস করে মানুষে মানুষে ও জাতিতে জাতিতে প্রভেদ থাকতে পারে; কিন্তু তারা সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাই তাদের সম্পর্ক হবে মানবতার ভ্রাতৃত্বের।

চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে কুরআনের ভূমিকা :

কুরআন সব মানুষের সার্বিক দিক ও বিভাগের সমন্বিত একটি পরিপূর্ণ জীবন দর্শন। চরমপন্থা ও সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব বিনির্মাণে কুরআন আহ্বান জানিয়েছে সবাইকে। যেমন যেকোনো অবৈধ হত্যাকাণ্ড গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। হত্যাকারীর স্থান জাহান্নামে হবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুসলিমকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে’ (সূরা নিসা : ৯৩)। অন্যায়ভাবে হত্যাকারী বিশ্বের সবাইকে হত্যাকারী হিসেবে আল্লাহর কাছে চিহ্নিত। আল্লাহ বলেন, ‘নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল’ (সূরা মায়িদা : ৩২)। ইসলাম তার অনুসারীদের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী হয়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে বারণ করে কুরআন বলছে, ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’ (সূরা আরাফ : ৫৬)। চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী সবার কাছেই ঘৃণিত। মহান আল্লাহও এদের ঘৃণার চোখে দেখে তাদের ওপর লা’নত করেছেন। বলা হয়েছে, ‘যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে লা’নত এবং মন্দ আবাস’ (সূরা রা’দ : ২৫)। চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘ফিতনা (অর্থ : প্রলোভন, দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, শিরক, ধর্মীয় নির্যাতন ইত্যাদি) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ’ (সূরা বাকারা : ১৯১)।
কুরআনে মুনাফিক চরিত্রের এমন কিছু চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীর কথা বলা হয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাধারণ লোকদের সাথে মিষ্টি-মধুর কথা বলে প্রতারণা করে এবং তাদের অশান্ত করে তোলে। জাহান্নামই এসব চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের আবাসস্থল হবে। এরশাদ হয়েছে, ‘যখন তাকে বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় করো, তখন তার আত্মাভিমান তাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে, সুতরাং জাহান্নামই তার যোগ্য’ (সূরা বাকারা ২০৬)।

চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মহানবী (সা:)-এর ভূমিকা :

বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত মহানবী (সা:) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তো বটেই আগেও তিনি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাই আমরা দেখতে পাই মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ‘হিলফুল ফুজুল’ সংগঠনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়েছেন। হিজরোত্তর মদিনায় স্থায়ীভাবে শান্তিশৃঙ্খল রা এবং চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদিনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত ইহুদিদের সাথে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেন।

মদিনা সনদ হিসেবে খ্যাত এ সনদের একটি ধারায় বলা হয়েছে, ‘তাকওয়া অবলম্বনকারী ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসীদের হাত সমবেতভাবে ওইসব ব্যক্তির হাতে উত্থিত হবে, যারা বিদ্রোহী হবে অথবা বিশ্বাসীদের মধ্যে অন্যায়, পাপাচার, সীমালঙ্ঘন, বিদ্বেষ অথবা দুর্নীতি ও ফ্যাসাদ ছড়িয়ে দিতে তৎপর হবে। তারা সবাই সমভাবে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, যদিও সে তাদেরই কারো আপন পুত্রও হয়ে থাকে।’

আরেকটি শর্তে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে এবং সাক্ষ্য প্রমাণে তা প্রমাণিতও হবে তার ওপর কিসাস গ্রহণ করা হবে হত্যার পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হবে।’ এভাবেই মহানবী (সা:) শুরু করেন মদিনার জীবনে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের কার্যকর
পদক্ষেপ। মহানবী (সা:) বলেছেন, ‘হত্যাকারীর ফরজ, নফল কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না’ (তিরমিজি)। অন্যত্র বলেছেন,
‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মানুষের মধ্যে হত্যা সম্বন্ধে বিচার করা হবে’ (বুখারি, মুসলিম)।

বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের করণীয় :
সাম্প্রতিককালে ইসলামের নামে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে (গুলশান ও শোলাকিয়া) সারা দেশবাসী উদ্বিগ্ন। গভীরভাবে বিবেচনা করলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাদ্বয় ইসলামকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই হয়েছে। অবশ্যই এহেন কর্মকাণ্ড ইসলামবিদ্বেষীদের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তেরই ফসল। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য প্রকৃত ইসলামি শিক্ষার ব্যাপক প্রচার প্রসার, পারিবারিক মূল্যবোধ জাগরিতকরণ, সম্মিলিত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা বাঞ্ছনীয়।

শেষ কথা…

সমাজ ও রাষ্ট্রবিধ্বংসী দুষ্টত চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে মূলোৎপাটন ও প্রতিরোধ করে ইসলাম বিশ্বব্যাপী শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে চায়। ইসলাম চরমপন্থা, সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, নৈরাজ্য এবং অরাজকতার সুস্পষ্ট বিরোধী। ইসলামের নামে যেকোনো হিংসা সৃষ্টিকরা কর্মকাণ্ড অনৈসলামিক ও অনৈতিক। ইসলাম মানুষে মানুষে হৃদ্যতা ওসৌহার্দ্য স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধির পৃথিবী গড়ার তাগিদ দেয়।

ভারতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব মহাত্মা. গান্ধীর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামকে আমি মহান নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ একটি ধর্ম হিসেবে নিশ্চিতভাবে জ্ঞান করি। তাই আমি পবিত্র কুরআনকে মনে করি মহান আদর্শের ভাণ্ডাররূপে এবং মুহাম্মদ সা:-কে শ্রদ্ধা করি একজন পয়গম্বররূপে।

লেখক: মো: সাদ চৌধুরী
চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা ছাত্রলীগ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সংবাদ সবসময়-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সংবাদ সবসময় কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

মতামত.........