,

কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘সাক্ষাৎ বাণিজ্য’ রেড অ্যালার্টকে ও কেয়ার করেনা [ভিডিও]

সংবাদ সবসময় ডেস্ক :

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের ৬৮টি কারাগারে সর্বোচ্চ সতর্কতা (রেড অ্যালার্ট) জারি করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। জঙ্গিরা চিঠির মাধ্যমে বাইরে যোগাযোগ করছে এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এই সতর্কতা।

কিন্তু এই নির্দেশনাকে থোরাই কেয়ার করছে কারারক্ষীরা। টাকার বিনিময়ে বিশেষ ব্যবস্থায় বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, কারাগারের ভেতরে টিফিন বাটিসহ নানা সরঞ্জাম নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এসব কাজ করতে দেখা গেছে কারারক্ষী ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তাদের।

গত শুক্রবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির কারাগারে সর্বোচ্চ সতর্কতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (২২ জুন) থেকে দেশের সবগুলো কারাগারে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দর্শনার্থী তল্লাশির সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে অভ্যন্তরীণ নজরদারিও। যেসব সেলে জঙ্গিদের রাখা হয়েছে সেসব সেলে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানোর প্রক্রিয়াও চলছে। এখন বন্দি জঙ্গিদের মা, বাবা, ভাই, বোন ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। পরিবারের যারা দেখা করতে আসেন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে নিশ্চিত হয়ে তবেই দেখা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা কী কথা বলে তা জানার জন্য গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকছেন সাক্ষাৎ কক্ষে।

বাংলামেইলের এই প্রতিবেদক সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রথম তিনদিন (বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখতে পেল কারারক্ষীদের সাক্ষাৎ বাণিজ্য।

বুধবার সকাল থেকে কারাগারের প্রধান ফটকে অবস্থান করে দেখা যায়, কারারক্ষী সেঞ্জু মিয়া, শাহজালাল ও জাকির সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটি করে প্রবেশ স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছেন।

প্রথম দিন এই বাণিজ্যের ভিডিও ধারণ করা সম্ভব না হলেও পরদিন বৃহস্পতিবার গোপন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করা হয়। কারারক্ষী সেঞ্জু মিয়া এবং শাহজালালকে কারা পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই টাকা লেনদেন করার দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এছাড়া জাকিরকে সাদা পোশাকে নিজেকে কারারক্ষী পরিচয় দিয়ে টাকার বিনিময়ে কারা অভ্যন্তরে লোক প্রবেশ করানোর ছবিও ধারণ করা হয়।

এখানেই শেষ নয়। এদিন এসবির দুই কর্মকর্তাকেও একই কাজে লিপ্ত থাকার ভিডিও ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এদের মধ্যে একজনের নাম জানা সম্ভব হলেও অন্যজন আগেই সটকে পড়ে। সোহাগ নামের এসবির ওই কর্মকর্তাকে এক নারীসহ ৩ যুবককে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য ৩ হাজার টাকা নিতে দেখা যায়। পরে এই টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি পুলিশের লোক। তারাও পুলিশের আত্মীয়। তাই ভেতরে যেতে দেয়ার চেষ্টা করছি।’

শুক্রবারও কারাগারের সামনে গিয়ে একই রকম দৃশ্য দেখা যায়। এদিনও এসবির কর্মকর্তারা এবং কারারক্ষীরা মিলেমিশে অর্থের বিনিময়ে কারা নারী-পুরুষদের ঢুকতে দিচ্ছিলেন।

পরে নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক কারারক্ষী জানান, আগে ভিআইপি ভাবে দেখা করতে হলে ভেতরে এক হাজার টাকা দেয়া লাগতো। কিন্তু ক’দিন আগে অনলাইন মিডিয়ায় নিউজ হওয়ার কারণে এখন লাগে দুই হাজার টাকা। এই টাকা দিলেই যে কাউকে কারাগারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বন্দিদের সাথে সাক্ষাৎ করানো হয়।

কোথায় যায় এই টাকা- জানতে চাইলে ওই কারারক্ষী জানান, এসব টাকা কারাগারের ডেপুটি জেলারদের হাত ঘুরে চলে যায় জেলারের হাতে। সেখান থেকে চলে যায় ওপরের বল্টুদের (তারকাযুক্ত কর্মকর্তাদের) হাতে। এই টাকার ভাগ আরো অনেক জায়গায় যায় বলেও জানান তিনি। আর এ কারণেই অনেক খবর হওয়ার পরও এই বাণিজ্য বন্ধ হয়নি।

কারাগারের এসব অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর করিব বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ যদি প্রমাণসহ থাকে, সে ক্ষেত্রে প্রমাণগুলো আমাকে দেখান। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি মাসের শুরুতেই কিছু নামধারি সাংবাদিক মাসিক চুক্তিতে টাকা নেয়ার জন্য উল্টাপাল্টা নিউজ করে। পরে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না। তবে আপনার অভিযোগের যদি কোনো প্রমাণ থাকে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনে একাধিক চক্র ঢাকা, খুলনা, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলসহ বেশ কয়েকটি কারাগারের চারপাশে ‘রেকি’ করে গেছে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। একই চক্র নিকটাত্মীয়-স্বজন পরিচয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ অন্তত অর্ধডজন কারাগারে ঢুকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে দেখা করে গেছে। অথচ এসময় কারা কর্তৃপক্ষ সতর্কতার সঙ্গে তাদের নাম-পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করেনি।

এমনকি তাদের দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবহেলা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ধরনের নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জঙ্গি বা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে কারা অভ্যন্তরে বড় ধরনের হামলা চালানো সহজ বলে গোয়েন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

গোয়েন্দাদের ভাষ্য, ‘কারা ষড়যন্ত্রের’ যে আভাস তারা পেয়েছেন এখনই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে তা সফল করা ষড়যন্ত্রকারী চক্রের পক্ষে খুব বেশি কঠিন হবে না।

এদিকে কারাবন্দি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন, জঙ্গি সদস্য ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে বাইরে থেকে আসা খাবার ও চিঠিপত্র যেভাবে অসতর্কভাবে, যাচাই না করেই ভেতরে পাঠানো হয় তাতেও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে বলেও গোয়েন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

গোয়েন্দারা জানান, ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও তারা নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এমনকি কারা অভ্যন্তরে বন্দিদের চিঠি-পত্র তদারকিতে যথেষ্ট ঘাটতি থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন গোয়েন্দারা।

শুধুই তাই নয়, গত বছর জুনে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ নেতা মাওলানা মাঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। ওই সময় তিনি তার অনুসারী মাওলানা মাইনুল ইসলাম ওরফে মাহিম ওরফে নানা ওরফে বদিউলকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠি উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। সম্প্রতি চট্টগ্রামে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যার পর বুলবুল নামে এক জেএমবি সদস্যের জবানবন্দিতেও কারাগার থেকে চিঠিতে নির্দেশনা দেয়ার তথ্য মিলেছে।

সুত্র : বাংলামেইল২৪ডটকম

মতামত.........