,

কুমিল্লায় বীরমুক্তিযোদ্ধা নারীনেত্রী শিরিন বানু মিতিল এর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন

57942মো. আরিফুর রহমান মজুমদার, কুমিল্লা প্রতিনিধি :

কুমিল্লায় বীরমুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট নারীনেত্রী শিরিন বানু মিতিল এর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কান্দিরপাড় টাউনহল মাঠে জানাজা পূর্বে এ মহিয়সী নারীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ্ব মো: ওমর ফারুক, ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মো: জাকির হোসেন,  জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহমেদ বাবুল, বিএমএ কুমিল্লার সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
মাগরিব নামাজের পর তার শ্বশুর বাড়ি সদর উপজেলার কাটাবিল এলাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শিরিন বানু মিতিল এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বুধবার রাত দেড়টায় ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী, এক ছেলে, ২ মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র নারীমুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং পুরুষের পোশাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
এ বীরমুক্তিযোদ্ধা বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকার ইন্দিরা রোডে তার নিজস্ব বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত দেড়টায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মহিয়সী এই নারীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ শুক্রবার সকাল ১০টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়। এরপর তার মরদেহ কুমিল্লা টাউন হল মাঠে আনা হয়। বাদ আছর এখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
শিরিন বানু মিতিল ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনায় খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু দম্পতির ঘরে জন্ম নেন। মা পাবনা জেলার ন্যাপ সভানেত্রী এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের এমপি ছিলেন, বাবা ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়ায় ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি সচেতন স্কুলজীবনেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন শিরিন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। ১৯৭০-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী এবং কিছু সময়ের জন্য পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ শুরু হলে ২৭ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। সেই যুদ্ধে তিনি বীরকন্যা প্রীতিলতাকে অনুসরণ করে পুরুষ বেশে অংশ নেন।
দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় পড়তে যান। সেখানকার পিপলস ফেন্ডশিপ ইউনিভারসিটি অব রাশিয়ায় পড়া শেষে ১৯৮০ সালে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফিরে তিনি নিজেকে সমাজকল্যাণে নিয়োজিত করেন।

২৮শে মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩৬ জন পাকসেনার সঙ্গে জনতার এক তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ জন পাকসেনা নিহত এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এছাড়াও ৩১শে মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপিত হয়। ৯ এপ্রিল নগরবাড়িতেও এক প্রচণ্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সে সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানব ঘোষ তার ছবিসহ পুরুষ সেজে যুদ্ধ করার খবরটি পত্রিকায় প্রকাশ করে দিলে তাঁ পক্ষে আর পুরুষ সেজে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তার যুদ্ধ থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে পাবনা শহর পাকবাহিনী দ্বারা দখল হলে তিনি ২০ এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত একমাত্র নারীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ‘গোবরা’য় যোগ দেন। পরবর্তীতে মেজর জলিলের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯নং সেক্টরে যোগ দেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু ছিলেন তিন সন্তানের জননী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রি-ট্রাস্ট নামে একটি এনজিওর পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।

মতামত.........