1434382972কবি এইচ.এম.আমিরের ছোটগল্প

“অবৈধ পথে বিদেশ গমন”

কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠে ছিল মাঝি পাড়া, কিন্তু সেই পাড়ায় আজ বাড়ির সংখ্যা শতের কাছাকাছি, কেনই বা সেই পাড়ার নাম মাঝি পাড়া রাখল আমার পূর্ব পূরুষেরা হয়ত ভাল জানবে। যাহোক সেই মাঝি পাড়ার খুব দরিদ্র ঘরের ছেলে রহিম, সেই ছোট্ট কালে বাবা সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়, ভাই-বোন তিন জন এবং তার মা’কে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার।

বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরার জন্য বেশী দূর আগাতে পারেনি তার লেখাপড়া, সেই ক্লাস নাইনে চাকরি করতে চলে আসে শহরের একটি কাপড়ের দোকানে, অল্প বয়সে বাধ্য হয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়, দোকানে চাকরি করে মাস শেষে যে বেতন পায় সব টাকা মায়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়, এইভাবে চলতে থাকে তার জীবনের দিন গুলি।

রহিমের পাশের দোকানে কুমিল্লার রাজু নামের একটি চাকরি করত, তারা পাশাপাশি কিছুদিন থাকতে থাকতে তাদের মধ্যে খুব একটা ভাল সম্পর্ক্ গড়ে উড়ল, প্রতি সপ্তাহে বন্ধের সময় এক সাথে ঘুড়তে বের হওয়া, সিনেমা দেখতে যাওয়া, একজন আরেক জনকে টাকা ধার দেয়া, সব মিলিয়ে তারা খুব ভালো বন্ধু। একদিন রাজু কিছু দিনের জন্য তার দেশের বাড়ি কুমিল্লা গেল, বাড়ি থেকে ফিরতে তার কিছুদিন দেরি হওয়ায় রহীম ভাবল হয়ত সে আর আসবে না, কিন্তু দশ-বার দিন পর রাজু ফিরে আসল, আসতে না আসতেই রহীমের সাথে দেখা করতে ছুটে আসল। –রহীম আমি শুধু তোর জন্য এখানে ছুটে আসলাম, তোর সাথে অনেক কথা আছে,  শোন আজ রাত দোকান বন্ধ করার পর আমার সাথে দেখা করবি।

–কি এমন কথা এখন বল। –না এখন বলা যাবে না, রাতে দেখা করবি কিন্তু। –আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তুই এখন যা । রাতে দোকান বন্ধ করে দুইজনে একটি জায়গায় বসল, রাজু রহিমকে তার সব কথা বলা শুরু করল, শোন রাজু, মালয়েশিয়া থেকে আমার একটা চাচাত ভাই এসেছে। তার কাছ থেকে মালেয়েশিয়া সম্পর্কে অনেক কিছু জিঙ্গেস করলাম, তার নাকি সেখানে অনেক বড় ব্যবসা আছে এমন কি তিন তিনটা দোকানের মালিক। আমাকে বলছে তার দোকানের জন্য দুই জন লোক দরকার, আমাকে বলল বিদেশ যাবো কিনা? তখন আমি তাকে আমার টাকার সমস্যাটা বললাম, সে আমাকে বলল তার একটা বন্ধু আছে যার মাধ্যমে আমরা বিশ হাজার টাকা দিয়ে মালেয়েশিয়া যেতে পারব,  আমি সাথে সাথে তোর কথাও বললাম। সে বলছে আমরা যখন ওখানে পৌছে যাব তখন সে আমাদের কে তার দোকানে নিয়ে যাবে। তখন আমাদেরকে ঐ দেশে কাজ করতে যে সমস্ত কাগজ পত্র লাগে সব করে দিবে বলেছে।

রহীম জিঞ্জাসা করল দোস্ত তুই কি এখন বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিস? হ্যাঁ কি করব বল, এই রকম দোকানে চাকরি করে জীবনে কি করতে পারবো তুই বল? রহীম আস্তে করে বলল তুই ঠিকই বলছিস। আচ্ছা আমরা কিভাবে যাব সে সম্পর্কে কি তোকে কিছু বলেছে নাকি? হ্যাঁ বলছেতো প্রতি মাসে নাকি সাগর পথে একবার করে মালেশিয়া মানুষ নিয়ে যায়। আমাদের যদি ভাগ্য ভাল হয় তাহলে প্রথম বারে চলে যেতে পারবো। রহীম তুই কি যাবি? আমি কিন্তু তুই না গেলেও চলে যাব………. বাড়ির অভাব আর ভাল লাগে না, যেভাবে হোক আমাকে বিদেশ চলে যেতে হবে। রহীম তুই চিন্তা করে দেখ বিশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পারবি কিনা?

রহীম সারারাত চিন্তা করল বিশ হাজার টাকা কোথায় পাবে । সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যেভাবে হোক সে বিশ হাজার টাকা জোগাড় করবে। যদি এই সামান্য টাকা দিয়ে যদি বিদেশ যেতে না পারে তাহলে জীবনেও আর বিদেশে যাওয়া হবে না। সকালে মাকে কল দিয়ে দেখি মা কোথাও বিশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পারে কিনা। এই কথা গুলো চিন্তা করতে করতে কখন যে তার ঘুম চলে আসল সে নিজেও জানে না। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের ভোরের আলো পড়ার সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠেই মাকে ফোন দিল। মা, আমি না একটা ছোট্ট ব্যবসা করতে চাচ্ছি, যার জন্য আমার বিশ হাজার টাকার প্রয়োজন। যেভাবে হোক আমার জন্য বিশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পারবে। আমি বাবা টাকা কোথায় পাবো তুই বল? মা আমাদের এলাকার লোক গুলো ব্যাংক থেকে কত টাকা লোন নেয়। না হয় তুমিও বিশ হাজার টাকা নাও না। আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখি নিতে পারি কি’না । ঠিক আছে মা তুমি ব্যাংকের লোকদের সাথে কথা বলে আমাকে একবার জানাও। মা ছেলের ব্যবসার জন্য টাকার জন্য পাশের বাড়ির এক মহিলার সাথে একটি এন,জি,ও এর কাছে গেল । এন,জি,ও তাকে বিশ হাজার টাকা লোন দিতে রাজি হল। রহীমের মা রহীমকে কল দিয়ে জানাল এন,জি,ও টাকা দিতে রাজি হয়েছে। রহীম খবরটা শুনার পর অনেক খুশি হল। মা আমি আগামী সপ্তাহে গিয়ে নিয়ে আসব। আপাতত টাকা গুলো তোমার কাছে রেখে দাও।

রহীম খুশি হয়ে রাজুর কাছে গিয়ে সংবাদটা দিল, রাজু সাথে সাথে তার এলাকার ভাইটাকে কল দিল এবং তাদের টাকা রেড়ি যেকোন সময় তারা যেতে প্রস্তুত সেটা জানিয়ে দিল। ভাইটা বলল তাহলে কিছুক্ষণ পর আমি তোকে ফোন দিয়ে বলব। রহীম আর রাজু দুই জনই খুব খুশি, যে যার বাসায় চলে গেল, বাসায় এসে সারারাত রহীম ঘুমাতে পারল না, সারারাত ভাবতে লাগল বিদেশ যাওয়ার পর কি কি করবে, তার মাকে এলাকার সবার চাইতে বেশি সুখে রাখবে, ভাই বোনদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মত মানুষ করবে যেটা সে পারে নি, সব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পর সে বিদেশ থেকে এসে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করবে, স্বপ্নপূরণ করার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল। পরদিন সকাল বেলা রাজু তার সাথে দেখা করতে সোজা রহীমের বাসায় চলে আসে। রহীম রাতে কাজল ভাই কল দিল, এই কাজল ভাই কে? আরে তোকেতো বলাই হয় নাই । আমাদের যে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে তার নাম কাজল, তিনি বলেছেন আগামী সপ্তাহের বুধবারে আমাদের চলে যেতে হবে, তিনিও দুই তিন দিনের মধ্যে চলে যেতে হবে। এখন আমরা আজ চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমরা বাড়িতে চলে যাবো, রাজু শোন এই খবরটা বাড়িতে আমি বলব না, মালেশিয়া পৌছার পর মা’কে কল করে বলব, ঠিক আছে আমিও বাড়িতে বলব না, দুই জনই চাকরিতে আমিও বাড়িতে বলব না।

দুই জনই চাকরি ছেড়ে চলে গেল, বাড়িতে এসে রহীম তার মা’র কাছ থেকে টাকা নিয়ে একদিন পর চলে গেল রাজুর বাড়িতে, ওখান থেকে তারা দুই জনই কাজলের বাড়িতে গেল, কাজল তাদের কাজ থেকে টাকা গুলো নিয়ে একজনের হাতে তারা দুই জনকে তুলে দিল। এই লোকটি তাদের একটি ঘরে নিয়ে গেল, ওখানে রহীম, রাজুর মত আরো শত খানিক লোক ওখানে ঘরের মধ্যে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর একটি লোক এসে তাদের সবাইকে গুনে গুনে একটি জাহাজে তুলে দিল। জাহাজটি তিন দিন পর্য্ন্ত পানিতে চলতে লাগল অথচ এই তিন দিনে মাত্র এক বার খাওয়ার দিল। তিন দিন পর এক জঙ্গলে গিয়ে ভিড়ল যেখানে কোন জীব জ্ন্তু ছাড়া আর কিছু নাই। ওখানে এক দিন থাকার পর আবার জাহাজ মালেশিয়ার উদ্দেশ্য রওনা করল। ছয় সাত দিন হয়ে যাচ্ছে অথচ মালেশিয়া পৌছার কোন খবর নাই, এই দিকে তাদের সবার খাওয়ার বন্ধ করে দিয়েছে, ক্ষুধার জ্বালায় সবাই সাগরের নোনা পানি পান করতে লাগল। তাদের মধ্যে একজন একজন অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল। রহীমের অবস্থাও তেমন ভালো না, কাল থেকে গায়ে জ্বর সারাক্ষণ বাড়ি ফিরে আসার জন্য কান্না করে, রাজু তাকে অনেক বুঝ দিতে লাগল, দোস্ত কালকের মধ্যে আমরা মালেশিয়া পৌছে যাব প্লিজ একটু ধর্য্য ধর। রহীম রেগে গিয়ে আর কত ধর্য্য ধরব শালা, কেন যে তুর পাল্লায় পড়েছিলাম আল্লাহ জানে।

 

হঠাৎ একজন কান্না করে উঠল, কে কোথায় আছিস এই খানে একজন মারা গেছে, খবর টা শুনার পর সবায় চমকে উঠল, সবাই মিলে লাশ টা পানিতে ছুড়ে পেলে দিল। রহীম ওইঠা দেখার পর আরো অসুস্থ হয়ে পড়ল। এই দিকে রহীমের মা ছেলের কোন খবর না পেয়ে পাগলের মত হয়ে গেল। শহরের যে দোকানে চাকরি করত ওখানে এসে জানতে পারল পনের বিশ দিন আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে রাজু আর রহীম, কোথায় এখন তারা এখন কেউ আর বলতে পারে না । একদিকে লোনের টাকা পরিশোধ করা অন্যদিকে ছেলের চিন্তাই তাদের পরিবারে একটি সুখের ছায়া নেমে আসল। জাহাজে এক এক করে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল। ইতোমধ্যে সাত জন মারা যাওয়ায় সবার মধ্যে একটা ভয় শুরু হয়ে গেল।এক সপ্তাহ ধরে তাদের কোন খাবার নাই। ফলে কেউ ভালোভাবে কথা বলতে পারতেছে না । এইদিকে রহীমের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে । কথা বলার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলল যার ফলে এখন শুধু কাঁদতে থাকে কোন কথা বলে না। রাত যায় দিন যায় কিন্তু তাদের গন্তব্য পৌছায় না, রাজু রহীমের পাশে বসা হঠাৎ রহীম মা বলে চিৎকার করে উঠল, রাজু তাকে কিছু বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। পাঁচ মিনিট পর রহীম চির তরে চলে গেল না ফেরার দেশে। পূরণ হল না তার সেই ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন গুলো। কয়েক দিন পর সেই জাহাজটি ধরা পড়ল মালেশিয়ান বাহিনীর হাতে।তখন রাজু কোন রকম জানটা নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের থানায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে ভালো করে তুলল এবং মালেশিয়া জেল খানায় বন্ধি করে রাখছে। বড়িতে কল দিয়ে রাজু সব রহীমের মাকে খুলে বলে।রহীমের মা ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে গেল।

উৎসর্গ: অবৈধ পথে বিদেশ গমনের চেষ্টায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া সকল বাংলাদেশীদের উদ্দেশ্যে

কবি এইচ.এম.আমিরের ছোটগল্প “অবৈধ পথে বিদেশ গমন”

মতামত.........