,

কবি আবুবকর সিদ্দিক এর গল্প “তুমি আশা” ৪৪ ও ৪৫ তম পর্ব একসাথে

“তুমি আশা” ৪৪ ও ৪৫ তম পর্ব একসাথে…

৪৪ তম পর্ব: সুমী এবং নিপা বাসায় ফোন দিয়ে জানিয়ে দিল আজ রাতে বাসায় আসবে না, তারা চলে গেছে জেসমিনের বাসায়। এদিকে ডাঃ আনিসুল বিকেল বেলায় জেসমিনদের বাসায় চলে যান জেসমিনের শারীরিক খবর নেওয়ার জন্য জেসমিনের আম্মুর সাথে বসে গল্প করছেন আর কফি পান করছেন। জিজ্ঞাসা করলেন জেসমিন কোথায়, তাহেরা বেগম বললেন গতকাল তার বান্ধবির বাসায় বেড়াতে গিয়েছে হয়তো কিছুক্ষনের মধ্যে চলে আসবে এমন সময় কলিং বেল বেঁজে উঠল। তাহেরা বেগম ডাঃ আনিসুল সাহেবকে বললেন এই তো মনে হয় চলে আসছে আপনি কফি খান আমি গেইট খুলে দিয়ে আসি।

তাহেরা বেগম গেইট খুলে সবাইকে দেখে আনন্দিত। সবাই বাসার ভেতরে চলে আসল। জেসমিন গেষ্ট রুমে গিয়ে দেখল তার আংকেল ডাঃ আনিসুল সাহেব বসে আছেন। সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করিল আংকেল আপনি কেমন আছেন। তিনি জবাবে বললেন মা মনি আমি ভাল আছি তোমার শারীরিক অবস্থা কেমন এখন বল। জেমনিল বলল আংকেল আপনার দোয়ায় আমি এখন ভাল আছি আলহামদুলিল্লাহ্‌। জেসমিন তার সহপাঠীদের ডেকে বলল তোরা এ দিকে আয়। দেখে যা কে আসছেন আমাদের বাসায়। জেসমিনের ডাক শুনে সবাই চলে গেল গেষ্টরুমে। জেসমিন সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিল ডাঃ আনিসুল সাহেবের সাথে। আর বলল আংকেল ওর নাম কাউসার আহমেদ চৌধুরী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এস, সি তে ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে, নিপা আমার খালাতো বোন আর ওর নাম সুমী তার আব্বু শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জনাব হাবিবুল বাসার সাহেবের এক মাত্র মেয়ে সুমী সে ও বি,এস,সি তে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে। আপনি আমাদের সবার জন্য দোয়া করবেন। ডাঃ আনিসুল সাহেব বললেন আমি তোমাদের সবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি একদিন তোমরাই হবে এদেশে কর্ণধার।

সবাই চলে গেল জেসমিনের রুমে আর তাহেরা বেগম রাতে খাবারের আয়োজন করলেন একা। ডাঃ আনিসুল সাহেব একজন অমায়িক মানুষ জেসমিনকে নিজের মেয়ের মত ভালবাসেন। তিনি হঠাৎ করে জেসমিনের ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন একাকি বসে আর তাহার চোখ দিয়ে বৃষ্টির মত পানি ঝরছে। কি ফুটফুটে মেয়েটি চঞ্চল মেয়েটি কি জানে তার জীবনে নেমে এসেছে এক কালবৈশাখী ঝড়, যে ঝড়ে ছোঁয়াতে মেয়েটি জীবন তচনচ করে নিয়ে যাবে। এমন সময় তাহেরা বেগম রুমে ঢুকে দেখতে পেলেন ডাঃ আনিসুল সাহেব কাঁদছেন। তাহেরা বেগম জিজ্ঞাসা করলেন ভাইয়া আপনি কাঁদছেন কেনো? উত্তরে তিনি বললেন আমি জেসমিনের কথা গুলি ভাবছিলাম আর আমার কান্না থামাতে পারি নি। কি করে আমি জেসমিনকে বলব মা জেসমিন তোমার ব্লাডক্যানসার হয়েছে কি ভাবে আমি তাকে বলব সাহস পাচ্ছি না।  ডাঃ আনিসুল সাহেবকে শান্তনা দিয়ে তাহেরা বেগম বললেন ভাইয়া করব আমরা আল্লাহু উপর আমার মেয়ের জীবন ছেড়ে দিলাম উনার যা ইচ্ছে তাতেই আমি রাজি। আসুন সবাই এক সাথে বসে খেয়ে নেই। সবাই এক সাথে বসে খাওয়া দাওয়া শেষ করলেন। ডাঃ আনিসুল সাহেব তাহেরা বেগমকে বললেন ভাবী জেসমিনকে এখন তার এই দুঃসংবাদ শুনানো যাবে না তাকে আনন্দ ফুর্তির মধ্যে রাখুন, তার যে ভাবে চলতে খুশি চলতে দিন। এই বলে তিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

কাউসার এবং জেসমিন তাহেরা বেগমের রুমের দরজা নক করে ভেতরে ঢুকল হাতে তাহেরা বেগমের শাড়ী।কাউসার তাহেরা বেগমের হাতে ব্যাগটা দিয়ে বলল খালাম্মা এই ব্যাগের ভেতরে একটা শাড়ী আছে এটা আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য উপহার। তাহের বেগম শাড়ীটা খুলে পড়ে নিলেন এবং সবার সামনে আসলেন আর বললেন দেখ কাউসারের পছন্দের সীমা নেই। তিনি খুশি হয়ে কাউসারের কপালে একটি চুমা দিয়ে বললেন বাবা তুমি বেঁচে থাক অনেক দিন তোমার মত ছেলে যেনো বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম নেয়। সবাই হেঁসে বলল শুধু আপনার জন্য কাউসার একা শাড়ী কিনে নাই,সুমী ও নিপার আম্মার জন্য ও কিনেছে আর আমাদের সবাইকে সে থ্রিপিস উপহার দিয়েছে। তাহেরা বেগম চলে গেলেন তাহার রুমে সুমী এবং নিপা বিছানায় শুয়ে পড়ল আর বলল জেসমিন তুই কাউসারের বিছানা রেডি করে দে। জেসমিন কাউসারের বিছানা রেডি করে দিয়ে বলল কাউসার তোমার বিছানা রেডি আছে ঘুমিয়ে পড়। এই বলে জেসমিন তার আম্মুর রুমে গিয়ে বলল আম্মু তা হলে ঘুমিয়ে পড়ি। কাউসার তার বিছানায় চলে গেল, জেসমিন গিয়ে বলল শান্ত ছেলের মত ঘুমিয়ে পড় আজ রাতে আর গল্প করতে পারব ন আমি ক্লান্ত। এই বলে জেসমিন চলে আসল তার রুমে।

৪৫ তম পর্ব: সকালে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জেগে উঠল কারণ আজ সকাল ১১টায় ভার্সিটিতে কাউসারের বিদায় অনুষ্টান ভার্সিটির পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননা দেওয়া হবে ভাল রেজাল্ট করার জন্য তাই সবাই সকাল নাস্তা খেয়ে ভার্সিটি চলে গেল। অনুষ্টান শুরু হল এক পর্যায়ে মনোজ্ঞ সাংকৃতিক অনুষ্টানে হঠাৎ করে জেসমিনের নাম প্রকাশ করা হল একটি গান পরিবেশন করার জন্য। জেসমিন মঞ্চে চলে গেল সবাই তাকে করতালি দিয়ে স্বাগতম জানাল। জেসমিন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গান শুরু করল। ( জেসমিনের প্রিয় একটি গান সে পরিবেশন করল। ওগো প্রিয় তোমার হাতটি ধরে যেন আমি ওপাড়ে তোমার সংগী হতে পারি গানটি শুনে সবাই চোখ দিয়ে পানি আসছে। হঠাৎ করে জেসমিন অজ্ঞান হয়ে মঞ্চে পড়ে গেল। সংগে সংগে তাকে হসপিটালে ভর্তি করা হল।

এদিকে জেসমিনের খবর শুনার সাথে সাথে তার আম্মু এবং আত্মীয় স্বজন এবং ডাঃ আনিসুল সাহেব হসপিটালে চলে গেলেন।অল্প কিছুক্ষন পরে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে আশংকা মুক্ত বলে ঘোষনা করলেন সবার মনে একটু আশার সঞ্চলন সৃষ্টি হল। ডাঃ আনিসুল সাহেব এবং তাহার আম্মা ভেতরে গেলেন। জেসমিন কে জিজ্ঞাসা করলে কি হয়েছিল জেসমিন বলল আমি একটি গান গেয়ে ছিলাম পরে কি হয়েছে আমি আর বলে পারি না। ডাঃ আনিসুল সাহেবের জেসমিনের পরীক্ষার সকল কাগজ পত্র দেখলেন সবাই ভাল আছে। কর্তব্যরত ডাঃ এসে বলেন আপনারা উনাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন আর কখনো এমন হলে তাকে এই ঔষধ গুলি সেবন করাবেন। কাউসার সহ জেসমিনকে নিয়ে তাদের বাসায় গেলেন সাথে ডাঃ আনিসুর সাহেব ও গেলেন। বাসায় পৌঁছে তাহেরা বেগম সবার জন্য চায়ের ব্যবস্থা করলেন। ডাঃ আনিসুর সাহেব তাহেরা বেগমের রুমে বসে আছেন জেসমিন এবং তার বান্ধবিরা তার রুমে বসে চা খাচ্ছেন। ডাঃ আনিসুল সাহেব তাহেরা বেগম কে বললেন জেসমিনের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবেন। কখন কি হয় বলা যায় না। কিছু হলে ভাবী আমাকে সংগে সংগে ফোন করবেন এই বলে তিনি চলে গেলেন।

নিপা এবং সুমীর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ করে জেসমিনের এই অবস্থা দেখে কেউ এখন জানতে পারে নাই জেসমিনের জীবনে এক অন্ধকারের কালো ছোঁয়া নেমে এসেছে জেসমিন নিজেও জানে না। কিছু ক্ষন পরে সুমীর আম্মা জহুরা বেগম চলে আসলেন জেসমিনকে দেখতে তাদের বাসায় এই প্রথম জহুরা বেগম আসলেন জেসমিনের বাসায় তাকে দেখলে। প্রথমে খোজ খবর নিয়েছে সুমীর কাছে। কলিংবেল বেজে উঠল। নিপা গেইট খুলে জহুরা বেগমকে দেখে আশ্চর্য্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল খালাম্মা আপনি কেমন আছেন। আমি ভাল আছি কোথায় আমার মা মণি জেসমিন তাকে দেখার জন্য আমার মনটা ছটফট করছে। নিপা জহুরা বেগমকে সংগে নিয়ে তার খালাম্মা তাহেরা বেগমের রুমে চলে গেল আর বলল খালাম্মা তার কথা আপনার কাছে সব সময় বলতাম উনি হচ্ছেন সেই মহিলা সুমীর আম্মা। নিপার মুখ থেকে এই কথাগুলি শুনার সাথে সাথে তাহেরা বেগম সুমীর আম্মা জহুরা বেগমকে জড়িয়ে ধরে বুকে নিলেন বয়সের দিকে জেসমিনের আম্মা একটু বড় হবেন। যদি তাহেরা বেগমের মনে অনেক কষ্ট ছিল মেয়ের জন্য সুমীর আম্মাকে জড়িয়ে ধরায় তিনি কিছুটা হলে ও স্তস্থি পেয়েছেন।

নিপা জেসমিনের রুমে গিয়ে বলল তোরা সবাই এখানে এখনো বসে আছিস দেখে যায় কে আসছেন। নিপার কথা শুনে সবাই চলে গেল তাহেরা বেগমের রুমে সুমীর আম্মাকে দেখে সবাই আনন্দিত। জহুরা বেগম দাড়িয়ে জেসমিনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন আর বললেন কি হয়েছিল মা তোর। জেসমিনের চলা ফেরা এবং আচার আচরণে জহুরা বেগম জেসমিনকে নিজের মেয়ে মত ভালবাসতেন।তাহেরা বেগম ও চোখ দিয়ে গড় গড় করে পানি ঝরাচ্ছেন আর মনে মনে বলতে লাগলেন ভাবী আপনি জানেন? আপনার এই স্নেহময়ী মেয়ে জেসমিন জীবন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে এখন প্রতিনিয়ত। কাউসার নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে আছে তাদের এই করুণ কাঁন্না দেখে আর ভাবছি সত্যিই ভাল মানুষ গুলিকে সমাজের সবাই ভালবাসে। যাক তাহেরা বেগম তড়িঘড়ি করে দুপুরের খাবারের আয়োজন করলেন সাথে নিপা এবং সুমী তাহাকে সাহায্য করল। দুপুরে খাবার খেয়ে জহুরা বেগম বললেন ভাবী আমি চলে যাব তবে মেয়ে জেমিনের প্রতি খেয়াল রাখবেন। তাহেরা বেগম বললেন জেসমিনের জন্য দোয়া করবেন সব সময়। তাহেরা বেগম কাউসারের দেওয়া শাড়ীটা পড়লেন। জহুরা বেগম বললেন ভাবী শাড়ীটাতে আপনাকে অনেক সুন্দর বানিয়েছে। তাহেরা বেগম বললেন ভাবী এটা কাউসারের দেওয়া উপহার। এমন সময় কাউসার এসে বলল খালাম্মা এটা আপনার উপহার আপনি ও পড়েন দেখবে আপনাকে ও শাড়ীতে কেমন মানিয়েছে কাউসারের আবদার রক্ষা করতে জহুরা বেগম শাড়ী পড়তে বাধ্য হয়েছেন দুজনকে শাড়ীতে অপুর্ব মানিয়েছে। জহুরা বেগম বললেন কাউসার তুমি অনেক দিন বেঁচে থেকো বাবা।

সবাই চলে গেলেন আজ রাতে জেসমিন তার আম্মুর কাছে ঘুমিয়েছে রাতে স্বপ্নে বার বার বলছে কাউসার আমার হাতটা শক্ত করে ধর তোমাকে ছেড়ে আমি এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাই না। তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখও কাউসার। তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালবাসি। তোমাকে ছাড়া কি করে আমি ওপাড়ে থাকব। হঠাৎ করে জেসমিনের আম্মুর ঘুম ভেঙ্গে যায় তিনি শুনতে পাচ্ছেন জেসমিনের কথা গুলি আর তাহার দুচোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তাহেরা বেগমের চোখের পানি জেসমিনের গালে পরা মাত্রই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।সংগে সংগে ঘুম থেকে উঠে বলছে আম্মু রাত অনেক হয়েছে আপনি জেগে জেগে এত রাত পর্যন্ত কাঁদছেন কেন। তাহেরা বেগম কত কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে সত্যটাকে লুকিয়ে রেখে বলছেন আমার কিছু হয় নি জেসমিন আয় মা ঘুমিয়ে পড়, মা-মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

চলবে…
এক নায়কের সাথে তিন নায়িকা জানিনা কার ভাগ্যে কাউসারের ভালবাসা আছে? জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বগুলোতে ধন্যবাদান্তে লেখক। আগামী পর্ব ছাপানো হবে শুক্রবার।

মতামত.........