,

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে বর্তমান রাজনীতির হালচাল

এম.শিমুল খান, গোপালগঞ্জ :

গোপালগঞ্জে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। গণ-সংযোগ , সভা-সম্মেলন ও অনুষ্ঠানাদিতে যোগদানসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে সরর হয়ে উঠেছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ প্রার্থীরাই এগিয়ে রয়েছেন।

গোপালগঞ্জ জেলা হচ্ছে আওয়ামীলীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মভূমি গোপালগঞ্জের নির্বাচনী আসনে প্রায় সবকটি সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামীলীগের প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন বিপুল ভোটে। আওয়ামীলীগের এ ঘাঁটিতে অন্যদের শুধু অস্তিত্ব রক্ষার ও দলীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখার চেস্টা। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এবং অন্য ছোট ছোট দলগুলোর তৎপরতা তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। জামায়েত ইসলামী বাংলাদেশের তৎপরতা নেই বললেই চলে।

গোপালগঞ্জ জেলার ৩টি আসনের মধ্যে গোপালগঞ্জ-১ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ১০ হাজার ৩৩৫ জন। এর মধ্য পুরুষ ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ৫৩ জন। মহিলা ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ২৮২ জন। এ আসনে ২০০১ সালে নির্বাচনে কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খাঁন (আ:লীগ) ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৯১ ভোটে বিজয়ী হন। প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী বিএনপির মেজর জেনারেল(অব:) মো: মহব্বতজান চৌধুরি পান ২০ হাজার ১৩৬ ভোট। ২০০৮ সালে বিজয়ী হন কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খাঁন। তিনি পান ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ২১৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি বিএনপির প্রার্থী মো: সেলিমুজামান পান ৯ হাজার ৯৮৬ ভোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও ২ লক্ষ ৪০ হাজার ৩০৪ ভোটে পেয়ে কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খাঁন (আ:লীগ) নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী জাতীয় পার্টির দীপা মজুমদার পান ৫ হাজার ৮৬৩ ভোট। সে সময় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।

গোপালগঞ্জ-২ আসনে ভোটের সংখ্যা ২ লক্ষ ৯৭ হাজার ৫৮৬ ভোট। এর মধ্য পুরুষ ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪০ জন এবং মহিলা ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ১৮২ জন। এ আসনে গোপালগঞ্জ সদর ও কাশিয়ানির একাংশ। ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৮২১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি বিএনপি প্রার্থী সাইফুর রহমান নান্টু পান ৮ হাজার ১৬৪ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বচনেও শেখ ফজলুল করিম সেলিম (আওয়ামীলীগ) ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ (বিএনপি) পান ৭ হাজার ৬৪৩ ভোট। ২০১৪ সালে নির্বাচনে শেখ ফজলুল করিম সেলিম পুনরায় ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি জাতীয় পার্টি (এরশাদ) কাজী সাহিন পান ৪ হাজার ৮৪ ভোট। এবারের নির্বাচনে বি এন পি অংশ নেয়নি। গোপালগঞ্জ ৩ আসনে ভোটের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৩ হাজার ৭৪৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লক্ষ ১৯ হাজার ৭৪৫ জন। মহিলা ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৯৯৯ জন। ২০০১ সালের নির্বাচনে (কোটালিপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ১৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি হাফেজ ওমর আহম্মদ (খেলাফত মজলিশ) পান ৭ হাজার ২২ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা (আওয়ামীলীগ) পুনরায় নির্বাচিত হন ১ লক্ষ ৫৮ হাজার ১৫৮ ভোট পেয়ে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি এস এম জিলানী (বিএনপি) পান ৪ হাজার ৪৫১ ভোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ১৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রার্থী এ জেড অপু শেখ পান ২ হাজার ৪৩০ ভোট। বিএনপি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ জেলায় ৩টি আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হচ্ছেন, গোপালগঞ্জ-১ আসন (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী একাংশ) আসনে নির্বাচন সংসদ কর্নেল (অবঃ) মুহাম্মদ ফারুক খাঁন, মহিলা সংরক্ষিত আসনে সংসদ উম্মে রাজিয়া কাজল, দলের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য মুকুল বোস, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছা সেবক লীগের অর্থ সম্পাদক কে এম মাসুদুর রহমান, যুবলীগের নেতা আতিয়ার রহমান দিপু। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারন সম্পাদক আরিফা রহমার রুমা, ব্যারিষ্টার রাজিব খাঁন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা এ আসনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী বলে শোনা যাচ্ছে। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দৌড়ে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম, জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ এফ ই শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীঁর, কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান পটু, ছাত্রদলের সাবেক নেতা কামরুজ্জামান টুটুল, কেন্দ্রীয় সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন। এ ছাড়া ইসলামিক শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মিজানুর রহমান মিজান, জাপার (এরশাদ) দীপা মজুমদার, বাসদের মোশায়েদ হোসেন ঢালী, জাসদ (ইনু) আজম শরিফ, জাসদ (আম্বিয়া) শহিদুল বাবর, হিন্দুলীগের রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস। তবে এ আসনে বিএনপি সেলিমুজ্জামান সেলিম ছাড়া দলের জন্য কোন নেতা মাঠে নেই। আওয়ামীলীগের মুহাম্মদ ফারুক খাঁন এমপি, মুকুল বোসসহ অনেক নেতাই মাঠে তৎপর আছেন। জাপার দীপা মজুমদার এ আসনে ২০১৪ সালের নির্বাচন করেছিলেন।

গোপালগঞ্জ-২ (গোপালগঞ্জ সদর-কাশিয়ানী একাংশ) আসনে বর্তমান সংসদ আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম তিনি এ আসন থেকে ৮ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দি। ঘন ঘন তিনি এলাকায় জনসংযোগ করে চলেছেন। তার রয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। এ ছাড়াও তার ছোট ছেলে ব্যারিষ্টার শেখ ফজলে নাঈম প্রতি মাসে একবার করে গোপালগঞ্জ আসছেন এবং জনসংযোগ ও বিভিন্ন সমবেশে যোগ দিচ্ছেন। শেখ রেহানাও এ আসনে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ আসনে শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপিই নিশ্চিত প্রার্থী বলে দলীয় অনেক নেতা কর্মী এ প্রতিবেদকে জানিয়েছেন।

এ আসনে দলের বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, সাবেক সভাপতি শরফুজ্জামান জাহাঙ্গির, সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক জেলা সভাপতি এম এইচ খান মঞ্জু , সাধারন সম্পাদক এম মনসুর আলী, সাধারন সম্পাদক মনিরুজ্জামান পিনু, জেলা যুবদল নেতা এ্যাডভোকেট তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন। এছাড়াও জাপা (এরশাদ) এর প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষক পার্টির সভাপতি সাইদুর রহমান টেপা, কেন্দ্রীয় সংগঠনিক সম্পাদক শেখ আলমগীর হোসেন, জেলা জাপার সভাপতি এ্যাডভোকেট গোলাম মেহেদি খাঁন ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থী কাজী শাহীন দলের মনোয়ন প্রত্যাশী। জাসদ (ইনু) জেলা সভাপতি ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শেখ মাসুদুর রহমান মাসুদ, জাসদ (আম্বিয়া) শহিদুল হক , হিন্দুলীগের অধ্যাপক শুকদেব বিশ্বাস, কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতা ডাঃ অসিত বরন রায়ের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে শোনা যাচ্ছে। ডাঃ অসিত বরন রায় ১৪ দল গত ভাবে এ আসনে মনোয়ন চাইতে পারেন। তিনি প্রায়শই এলাকায় আসছেন ঢাকা থেকে। এ ছাড়াও জেলা বিএনপি সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ও এলাকার জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালিপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ আসনটি তার নিজ নির্বাচনী এলাকা। ১৯৮৬ সাল থেকে এ আসনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এ আসনটি আওয়ামীলীগের শক্তিশালী ঘাঁটি। শত ভাগ ভোটারই নৌকার সমর্থক। শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়নের জোয়ারের কারনে দশম সংসদ নির্বাচনে আবারও তাকে ভোট দেওয়ার জন্য জনগন প্রস্তুত বলে এলাকার সাধারন মানুষসহ নেতাকর্মীরা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে। এ আসনে জাপা (এরশাদ) সম্ভাব্য প্রার্থী এ্যাডভোকেট শিশির চৌধুরী, এ জেড অপু শেখ। অপু শেখ ২০১৪ সালে এ আসনে জাপার প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে ছিলেন। এ আসনে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এবং টুঙ্গিপাড়ার সন্তান এস এম জিলানী দলের মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন। ওই দলের অন্য কোন নেতা এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী নয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া হিন্দুলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক বিরেন্দ্রনাথ মৈত্য, জাসদ (ইনু) কোটালিপাড়ার উপজেলার কমিটির সভাপতি অরুন চন্দ্র সাহা, জাসদ (আম্বিয়া) রিয়াজুল ইসলাম তালুকদারের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে শোনা যাচ্ছে। এ আসনে বিরেন্দ্রনাথ মৈত্য ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দলের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন।

গোপালগঞ্জ জেলার আওয়মীলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান বলেন, গোপালগঞ্জের মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী ও নৌকার সামর্থক। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে পুনরায় সরকার গঠন করে হ্যাট্রিক করবে আমাদের দল।

গোপালগঞ্জ জেলার আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক ইলিয়াস হক বলেন, গোপালগঞ্জের আওয়ামীলীগের তিনটি আসনে কোন বিকল্প নাই। দল যাদের মনোনয়ন দিবে বিপুল ভোটে তারা নির্বাচিত হবেন।

জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক বলেন, দল জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহন করার সিদ্ধান্ত নিলে এবং এ জেলায় তিনটি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিলে আমরা দলের প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ভাবে দলের কাজ করে আমাদের অবস্থান ঠিক রাখব।

মতামত.........